বাংলা মাসের শেষ দিনকে বলা হয় ‘সংক্রান্তি’।
সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন বা সঞ্চারকে সংক্রান্তি বলে। বছরে মোট বারোটি সংক্রান্তি রয়েছে, যার প্রতিটিতেই বিশেষ ধর্মাচার বা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজে পৌষ মাসের শেষ দিনে ‘পৌষ সংক্রান্তি’ (বা মকর সংক্রান্তি) এবং চৈত্র মাসের শেষ দিনে ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে নতুন ধানের পিঠাপুলি তৈরি করা হয় এবং চৈত্র সংক্রান্তিতে বর্ষবিদায়ের চড়কপূজা, শিবের গাজন ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। পুরান ঢাকা ও বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রান্তি উৎসবটি ‘সাকরাইন’ নামেও বিশেষভাবে পরিচিত।
উদ্দীপকের চিত্র ১-এ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী ধর্মানুষ্ঠান রথযাত্রা প্রদর্শিত হয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকের আলোকে রথযাত্রা উৎসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
১. সময়কাল ও তিথি: প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা শুরু হয়।
২. অধিষ্ঠিত দেব-দেবী: সুসজ্জিত চাকাযুক্ত কাঠের তৈরি রথে তিনজন দেব-দেবী—ভগবান জগন্নাথ (বিষ্ণুর অবতার), তাঁর অগ্রজ বলরাম (বা বলভদ্র) এবং কনিষ্ঠা ভগিনী সুভদ্রা অধিষ্ঠিত থাকেন।
৩. উৎসবের রীতি: ভক্তগণ ভক্তিভরে রশির সাহায্যে রথ টেনে এক দেবালয় বা মন্দির থেকে অন্য একটি নির্দিষ্ট দেবালয় বা গুণ্ডিচা মন্দিরে (মাসির বাড়ি) নিয়ে যান। সেখানে সাত দিন দেব-দেবী অবস্থান করার পর নবম দিনে অর্থাৎ আষাঢ় মাসের শুক্লা একাদশীর তিথিতে পুনরায় রথ টেনে পূর্বের মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়, যাকে ‘পুনর্যাত্রা’ বা ‘উল্টোরথ’ বলা হয়।
৪. ধর্মীয় মাহাত্ম্য: সনাতন শাস্ত্রে বিশ্বাস করা হয় যে, রথের ওপর জগন্নাথ দেবকে দর্শন করলে এবং ভক্তিভরে রথের পবিত্র রশি স্পর্শ বা টানলে পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তি ও মোক্ষ লাভ হয়। এই রথযাত্রা উপলক্ষে নয় দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কীর্তন ও আনন্দমেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও মেলবন্ধন সৃষ্টি করে।
উদ্দীপকের চিত্র ২-এ প্রদর্শিত অনুষ্ঠানটি হলো সনাতন ধর্মের ভক্তিমূলক আরাধনার এক বিশেষ আয়োজন নামযজ্ঞ (বা নামসংকীর্তন / অষ্টপ্রহর নামযজ্ঞ)। এই অনুষ্ঠানটির পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে গুরুত্ব অপরিসীম।
পাঠ্যপুস্তকের আলোকে নামযজ্ঞের পারিবারিক ও সামাজিক গুরুত্ব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ভগবান শ্রীহরির নাম সংকীর্তন ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা: নামযজ্ঞে সুর, তাল, ছন্দ ও বাদ্যযন্ত্রের (খোল, করতাল) সহযোগে সম্মিলিত কণ্ঠে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীরামচন্দ্রের নাম এবং হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করা হয়। শাস্ত্র মতে, কলিযুগে হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে জীবের সকল পাপ ও পার্থিব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে পরম শান্তি ও পুণ্য লাভ হয়।
২. পারিবারিক পরিমণ্ডলে শান্তি ও ভক্তির বিকাশ: পারিবারিক পর্যায়ে নামযজ্ঞের আয়োজন করলে গৃহকোণ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পবিত্র হয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ধর্মীয় অনুরাগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিনয় ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। তিন ঘণ্টায় এক প্রহর হিসেবে স্থান ও আয়োজনের পরিধিভেদে এটি কয়েক প্রহরব্যাপী (যেমন একপ্রহর, চারপ্রহর বা অষ্টপ্রহর অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা) অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
৩. সামাজিক মেলবন্ধন ও সংহতি: নামযজ্ঞ কেবল নির্দিষ্ট পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সর্বজনীন এক মহা মিলনোৎসবে পরিণত হয়। দূরদূরান্ত থেকে শত শত ভক্ত, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী এই পবিত্র অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
৪. সামাজিক সাম্য ও শ্রেণিভেদ দূরীকরণ: নামযজ্ঞে ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড় বা জাতপাতের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সকলে একাসনে বসে হরিনাম শ্রবণ করেন এবং একসাথে প্রসাদ গ্রহণ করেন। এটি সমাজে শ্রেণিগত বৈষম্য দূর করে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য জোরদার করে।
৫. নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের উন্মেষ: নামযজ্ঞের মতো ধর্মীয় উৎসব মানুষের মনকে অহংকার, পরশ্রীকাতরতা ও ক্রোধমুক্ত করে বিনয়ী, সহানুভূতিশীল ও সংযমী হতে উদ্বুদ্ধ করে, যা একটি শান্তিময় আদর্শ সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
অতএব বলা যায়, উদ্দীপকের চিত্র ২-এ প্রদর্শিত নামযজ্ঞ সনাতন ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে এবং সামাজিক ঐক্য, সাম্য ও সম্প্রীতি রক্ষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।