প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু গ্রহণ না করাকে অপরিগ্রহ বলে।
'অপরিগ্রহ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো গ্রহণ না করা। যোগশাস্ত্র অনুসারে, নিজের প্রয়োজন নেই এমন বস্তু তো নয়ই, এমনকি প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তুও গ্রহণ না করা অপরিগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ যখন জীবনের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সামগ্রী (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি) নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে এবং লোভ ও ভোগবিলাস বর্জন করে সংযমী জীবনযাপন করে, তখন চিত্ত একাগ্র হয়। জীবনের মূল লক্ষ্য ঈশ্বর আরাধনায় আত্মনিয়োগ করার জন্যই এই গুণের চর্চা করা হয়।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ প্রদর্শিত আসনটি হলো বৃক্ষাসন (Vrikshasana)।
বৃক্ষের মতো স্থির ও ঋজু হয়ে এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে এ আসনটি অনুশীলন করতে হয় বলে এর নাম বৃক্ষাসন।
বৃক্ষাসনের অনুশীলন পদ্ধতি নিচে ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলো:
১. প্রথমে দুই পা জোড়া করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। পায়ের পাতা মাটিতে সমানভাবে লেগে থাকবে।
২. এবার ডান পা হাঁটুতে ভাঁজ করে ডান পায়ের গোড়ালি বাম উরুর মূলে স্থাপন করতে হবে। পায়ের পাতা উরুর ভেতরের অংশের সাথে লেগে থাকবে এবং পায়ের আঙুলগুলো থাকবে নিচের দিকে ফেরানো।
৩. এরপর শুধু বাম পায়ের ওপর ভারসাম্য রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে।
৪. উভয় হাতের তালু নমস্কারের ভঙ্গিতে বুকের কাছে এনে জোড়া করতে হবে। তারপর হাত দুটি সোজা মাথার ওপর তুলতে হবে।
৫. দৃষ্টি সামনের কোনো স্থির বিন্দুতে নিবদ্ধ রেখে এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বজায় রেখে এভাবে ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড নিশ্চল অবস্থায় দাঁড়াতে হবে।
৬. এরপর হাত দুটি নামিয়ে এবং ডান পা সোজা করে পূর্বের মতো দুই পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে।
৭. একইভাবে ডান পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বাম পা ভাঁজ করে বিপরীত পাশেও আসনটি করতে হবে। আসন শেষে শবাসনে ১০ সেকেন্ড বিশ্রাম নিতে হবে। নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে সময় বাড়িয়ে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত করা যায়।
উদ্দীপকের চিত্র-২ এ নির্দেশিত আসনটি হলো হলাসন (Halasana)। এ আসনটি নিয়মিত অনুশীলন করলে মানবদেহের মেরুদণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ গ্রন্থির ওপর অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও বহুমুখী শারীরিক উপকারিতা অর্জিত হয়।
এ আসনটি অনুশীলনের সময় শরীরের আকৃতি কৃষিকাজে ব্যবহৃত লাঙল বা হলের মতো দেখায় বলে একে হলাসন বলা হয়। এটি মূলত চিৎ হয়ে শুয়ে পা দুটি মাথার পেছনের মাটিতে স্পর্শ করিয়ে মেরুদণ্ডকে প্রসারিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাসন।
হলাসন নিয়মিত অনুশীলনের প্রধান শারীরিক উপকারিতাগুলো নিচে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. মেরুদণ্ডের নমনীয়তা ও স্বাস্থ্য: এ আসনটি নিয়মিত চর্চা করলে মেরুদণ্ডের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পায় এবং মেরুদণ্ড নমনীয় ও সুস্থ থাকে। মেরুদণ্ড সংলগ্ন স্নায়ুকেন্দ্র এবং পিঠের দুপাশের পেশি সতেজ ও সক্রিয় হয়, ফলে পিঠ ও কোমরের ব্যথা দূর হয়।
২. রোগ নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণ: হলাসন নিয়মিত অনুশীলনে ডায়াবেটিস, বাত, সায়টিকার তীব্র ব্যথা, পেটের নানা পীড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর বা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৩. অভ্যন্তরীণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি: পেটের ওপর চাপ পড়ার ফলে যকৃৎ (Liver), প্লীহা (Spleen), অগ্ন্যাশয় এবং মূত্রাশয়ের কার্যক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় এবং হজমশক্তি উন্নত হয়।
৪. হরমোন নিঃসরণ ও গ্রন্থির সক্রিয়তা: গলবিল অঞ্চলের থাইরয়েড, প্যারাথাইরয়েড এবং টনসিল গ্রন্থিতে রক্ত চলাচল বাড়ে, ফলে এগুলো সবল ও সক্রিয় হয়ে শারীরবৃত্তীয় ভারসাম্য রক্ষা করে।
৫. মেদ হ্রাস ও দেহসৌষ্ঠব গঠন: নিয়মিত অনুশীলনে পেট, কোমর ও নিতম্বের অতিরিক্ত মেদ ঝরে যায় এবং দেহ সুঠাম, সুন্দর ও হালকা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, হলাসন শুধু মেরুদণ্ডের সুস্থতাই বজায় রাখে না, বরং সমগ্র দেহের রক্ত সঞ্চালন, স্নায়বিক সামঞ্জস্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অদ্বিতীয় ভূমিকা পালন করে। তাই শারীরিক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু লাভের জন্য হলাসনের নিয়মিত অনুশীলন অপরিসীম উপকারী।