বিবাহের মূল পর্বই হচ্ছে সম্প্রদানপর্ব।
বিবাহের নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করে বর ও কনেকে বিয়ের পিঁড়িতে মুখোমুখি বসতে হয়; বর পূর্বমুখী এবং কনে পশ্চিমমুখী হয়ে বসে। যিনি কন্যা সম্প্রদান করবেন তিনি উত্তরমুখী হয়ে বসেন। পুত্তলি অঙ্কিত, আম্রপল্লবে সুশোভিত এবং গঙ্গাজলপূর্ণ একটি ঘটের উপর বরের চিৎ করা ডান হাতের উপর কনের ডান হাত স্থাপন করা হয়। এরপর লাল গামছায় বাঁধা পাঁচটি ফল, কুশপত্র ও ফুলের মালা দিয়ে হাত দুটি বেঁধে দেওয়া হয়। সম্প্রদানকর্তা দেবতাদের নাম উচ্চারণপূর্বক উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও আনন্দঘন মাঙ্গলিক পরিবেশের মধ্যে কন্যা সম্প্রদান সম্পন্ন করেন।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এর বিষয়টি হিন্দুধর্মের পারলৌকিক সংস্কার 'আদ্যশ্রাদ্ধ'-কে নির্দেশ করে।
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রথমে যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় তাকে আদ্যশ্রাদ্ধ বলে। অশৌচকাল উত্তীর্ণ হলে তার পরদিন এই শ্রাদ্ধের আয়োজন করা হয়। আদ্যশ্রাদ্ধের পূর্ণ নাম 'আদ্য একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ'। একজন মাত্র মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে করা হয় বলেই এর এরূপ নাম। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে আদ্য একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধে প্রথমে প্রদীপ প্রজ্বলিত করে বাস্তুপুরুষ, যজ্ঞেশ্বর ও ভূস্বামীর পূজা করতে হয়। এরপর মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে আসন, ছাতা, পাদুকা, বস্ত্র, অন্ন, জল, তাম্বুল, মালা ও বিছানা প্রভৃতি শ্রদ্ধাসহকারে উৎসর্গ করা হয় এবং পিণ্ডদান করে শ্রাদ্ধ সমাপ্ত করা হয়।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ দেখা যায়, একজন পুরোহিতের উপস্থিতিতে ও তত্ত্বাবধানে ধর্মীয় আচার মেনে মৃত ব্যক্তির পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য শ্রদ্ধাসহকারে বিভিন্ন সামগ্রী উৎসর্গ ও দান করা হচ্ছে। সুতরাং চিত্র-১ এর বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকের আদ্যশ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।
উদ্দীপকের চিত্র-২ এ প্রদর্শিত সংস্কারটি হলো 'বিবাহ'। হিন্দু সমাজ ও ধর্মীয় জীবনে এ সংস্কারটির গুরুত্ব অপরিসীম।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে মানবজীবনের দশবিধ সংস্কারের মধ্যে বিবাহই সর্বশ্রেষ্ঠ। হিন্দুবিবাহ কেবল কোনো সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি জীবনের পবিত্রতম মাঙ্গলিক অধ্যায় ও ধর্মীয় জীবনের চর্চা। স্ত্রী হচ্ছেন পুরুষের সহধর্মিণী; স্ত্রীকে বাদ দিয়ে পুরুষের কোনো ধর্মকার্যই এককভাবে সম্পন্ন হয় না। বিবাহের মাধ্যমে বর ও বধূ অগ্নির সম্মুখে ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণের পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে আমৃত্যু সুখে-দুঃখে একাত্ম হয়ে থাকার প্রতিজ্ঞা করে।
বিবাহের মাধ্যমেই গার্হস্থ্যজীবনের সূচনা হয়। এর দ্বারা স্বামী সন্তানের জনক হিসেবে পিতৃত্ব এবং স্ত্রী জননীরূপে মাতৃত্ব লাভ করেন। মাতা, পিতা, পুত্র ও কন্যাকে নিয়ে গড়ে ওঠে সুখের সংসার। এই পারিবারিক পরিমণ্ডলকে কেন্দ্র করেই মানুষের মধ্যকার প্রেম-প্রীতি, স্নেহ, মায়া-মমতা ও বাৎসল্যের মতো সুকুমার বৃত্তিগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে বিকশিত হয়। পরিবারের সকল সদস্যের ভরণ-পোষণ ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গভীর শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিকতার বিকাশ ঘটে, যা আলোকিত মানুষ তৈরির সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে।
অতএব, পরিশেষে বলা যায়, ব্যক্তির আত্মিক মুক্তি, সমাজধর্ম পালন এবং পারিবারিক জীবনে স্থিতি ও পূর্ণতা আনয়নে বিবাহ সংস্কারের ভূমিকা অনন্য ও অনস্বীকার্য।