উদ্দীপক-১:
একাত্তরের সে রাত্রি, ভয়ংকর কালো ঘন,
রক্তে ভিজে উঠেছিল পবিত্র আমার ধন।
পাক বাহিনীর জুলুমে কেঁপেছিল গ্রাম শহর
জ্বলে উঠেছিল মা-বোনের ক্রন্দন ভর।
উদ্দীপক-২:
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
"ভয় নাই, ওরে ভয় নাই।
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই।"
তপুর মতো অকুতোভয় ও আদর্শবান দেশপ্রেমিক তরুণের আত্মত্যাগে তীব্র অপরাধবোধ ও অন্তর্জ্বালায় ভুগে রাহাত এ কথা বলেছিল।
তপু ছিল ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক যিনি মাতৃভাষার মর্যাদায় বুক পেতে শহিদ হয়েছেন। তপুর এই মহান আত্মত্যাগের বিপরীতে রাহাত নিজেকে স্বার্থপর, ভীরু ও অক্ষম মনে করছিল। এমন একজন মূল্যবান তরুণের মৃত্যুতে গভীর শোক ও আত্মগ্লানি থেকেই সে নিজের মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছিল।
উদ্দীপক-১-এ বর্ণিত হানাদারদের বর্বর আক্রমণ, গণহত্যা ও স্বজন হারানোর কান্নার সাথে 'একুশের গল্প'-এ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পুলিশি তাণ্ডব ও রক্তপাতের দিকটি ফুটে উঠেছে।
'একুশের গল্প'-এ ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষার দাবিতে শান্ত মিছিলে পাকিস্তানি পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণ, তরুণদের হত্যা এবং মায়ের বুক খালি হওয়ার মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপক-১-এও একাত্তরের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীর জুলুম, রক্তে মাটি ভেজা এবং মা-বোনের আর্তনাদের যে শোকাবহ দৃশ্য আঁকা হয়েছে, তা 'একুশের গল্প'-এর শাসকগোষ্ঠীর নিষ্ঠুর আগ্রাসন ও রক্তের হোলিখেলার সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য ও যথার্থ। আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে অমরত্ব লাভ এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস যোগানোর যে বাণী উদ্দীপক-২-এ উচ্চারিত হয়েছে, তা 'একুশের গল্প'-এর তপুর আত্মত্যাগের চেতনার সাথে একাত্ম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, সত্য ও ন্যায়ের জন্য যিনি নিঃশেষে প্রাণ দান করেন, তাঁর কোনো বিনাশ নেই; তিনি অমর। 'একুশের গল্প'-এ তপু মাতৃভাষার জন্য নিজের অমূল্য জীবন বিসর্জন দিয়ে চিরঞ্জীব হয়েছে। তার এই আত্মাহুতি বাঙালি জাতিকে পরবর্তীতে চুয়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আত্মবলিদানের অনন্ত প্রেরণা জুগিয়েছে।
তপুর আত্মদান বৃথা যায়নি; বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হৃদয়ে আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বাধীনতার মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছে। সুতরাং, উদ্দীপক-২-এর কবিভাবনা ও তপুর আত্মত্যাগ উভয়ই জাতির চিরন্তন পথপ্রদর্শক ও প্রেরণার উৎস।
একমাত্র কবিই নিমগাছের কাঠ বা পাতার উপযোগিতা না খুঁজে তার রূপের মুগ্ধ প্রশংসা করেছিলেন বলে গাছটি কবির সঙ্গে চলে যেতে চেয়েছিল।
বনফুলের 'নিমগাছ' গল্পে দেখা যায়, সবাই নিমগাছের ডাল ভাঙে, পাতা ছেঁড়ে কিংবা ছাল তুলে নিয়ে কেবল ব্যবহারিক স্বার্থ খোঁজে। কিন্তু একদিন এক কবি এসে নিমের রূপ, পাতার পাতার সৌন্দর্য ও ফুলের সুবাসে মুগ্ধ হয়ে তার প্রশংসা করেন। প্রথমবার কেউ তাকে স্বার্থপরের মতো আঘাত না করে অন্তর দিয়ে ভালোবেসেছিল বলেই নিমগাছটি কবির সঙ্গে চলে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেছিল।
উদ্দীপকের মকবুল 'নিমগাছ' গল্পে বর্ণিত স্বার্থপর মানবসমাজকে ইঙ্গিত করে, যারা কেবল অন্যকে শোষণ ও নিজের কাজে ব্যবহার করতে জানে কিন্তু বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন বা স্নেহ দিতে জানে না।
'নিমগাছ' গল্পে মানুষ নিমগাছের ছাল, পাতা, হাওয়া সবই ভোগ করে, কিন্তু গাছটির কোনো পরিচর্যা করে না; বরং প্রয়োজনে তাকে পিটিয়ে ডালপালা ভেঙে নেয়।
উদ্দীপকের বৃদ্ধ মকবুলও তেরো বছরের কিশোরী টুনিকে দিয়ে ঘরের ধান ভানা থেকে জমির সমস্ত কঠিন পরিশ্রম করায়, অথচ তার প্রতি কোনো ভালোবাসা বা সহানুভূতি প্রকাশ করে না। মকবুলের এই নিষ্ঠুর ও স্বার্থান্বেষী আচরণ গল্পের স্বার্থপর সমাজেরই হুবহু প্রতিচ্ছবি।
হ্যাঁ, আমি মন্তব্যটির সাথে সম্পূর্ণ একমত। উদ্দীপকের টুনি চরিত্রটি 'নিমগাছ' গল্পের শেষ চরণে বর্ণিত মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মীবউটিরই এক জীবন্ত প্রতিরূপ।
'নিমগাছ' গল্পে লেখক দেখিয়েছেন, যে লক্ষ্মীবউটি দিনরাত পরিবারের সবাইকে নিঃস্বার্থ সেবা দেয় কিন্তু কোনো আদর-ভালোবাসা পায় না। তার মন চায় এই অবহেলার সংসার ছেড়ে মুক্ত বাতাসে চলে যেতে, কিন্তু সংসারের মায়াজাল ও সামাজিক শৃঙ্খলের শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত থাকায় সে কোথাও যেতে পারে না।
উদ্দীপকের টুনিও বৃদ্ধ মকবুলের বাড়িতে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অবহেলিত জীবন কাটায়। মন্তুর ভালোবাসার পরশে সে অন্যত্র চলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতার শিকড়ে বন্দি থাকায় সে যেতে পারে না।
অতএব, নিঃস্বার্থ সেবা, নিদারুণ অবমূল্যায়ন এবং মুক্তির বাসনা থাকা সত্ত্বেও নিরুপায় বন্দিদশার দিক থেকে টুনি অবিকল 'নিমগাছ' গল্পের লক্ষ্মীবউয়েরই প্রতিমূর্তি।
উদ্দীপক-১:
হে সূর্য, তুমি তো জানো,
আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব।
সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে
এক টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে
কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই।
উদ্দীপক-২:
নুরু, পুশি, আয়শা, শফি সবাই এসেছে
আমবাগিচার তলায় যেন তারা হেসেছে।
রাঁধুনিদের শখের রাঁধার পড়ে গেছে ধুম
বোশেখ মাসের এই দুপুরে নেইকো কারো ঘুম।
গ্রামের অবস্থা ভালো নয় এবং দশঘরিয়া গ্রামের লোকেরা ব্রাহ্মণ পরিবারকে পেয়ে নিজেদের গ্রামে বসাতে আগ্রহী ছিল, তবুও হরিহর পূর্বে কারও পরামর্শ না নিয়ে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি বলে তাৎক্ষণিক রাজি হয়নি।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পে হরিহর ছিল দরিদ্র ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক নিশ্চিন্দিপুরের বাসিন্দা। সে চেয়েছিল গ্রামের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এবং পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ত্যাগ করার সামাজিক-পারিবারিক ভালো-মন্দ দিক বিবেচনা করে ধীরে-সুস্থে পদক্ষেপ নিতে। তাই সে প্রস্তাব শুনেই হুট করে হ্যাঁ বলেনি।
উদ্দীপক-১-এ শীতের তীব্রতায় গরম কাপড়ের চরম অভাব ও দারিদ্র্যের যে নিদারুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তার সাথে 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের হরিহরের পরিবারের চরম অর্থনৈতিক দৈন্যদশার চিত্র সাদৃশ্যপূর্ণ।
'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পে অপুর ছেঁড়া ফ্রক, দুর্গার জীর্ণ বেশবাস এবং ভাঙা ঘরের করুণ চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। অভাব-অনটনে জর্জরিত পরিবারটিতে প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র কিংবা ভালো খাবারের সবসময় টানাপোড়েন লেগে থাকত।
উদ্দীপক-১-এও খড়কুটো জ্বালিয়ে এক টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে দরিদ্র মানুষের শীত আটকানোর যে আকুতি প্রকাশ পেয়েছে, তা নিশ্চিন্দিপুরের হরিহরের পরিবারের চিরকালীন দারিদ্র্যের বাস্তব রূপকেই নির্দেশ করে।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ। উদ্দীপক-২-এ পল্লীপ্রকৃতির কোলে দুরন্ত গ্রামীণ শৈশবের যে প্রাণবন্ত আনন্দ ও পিকনিকের মেজাজ প্রকাশ পেয়েছে, তা-ই মূলত 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের মূল উপজীব্য।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের মূল সৌন্দর্য অপু ও দুর্গার ভাইবোনের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং গ্রামবাংলার বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ। বৈশাখের দুপুরে রোদে ঘুরে কাঁচা আম কুড়ানো, জারুল তলায় বসে খেলা করা এবং শখের রান্নাবান্নার যে চিরায়ত আনন্দময় শৈশব গল্পে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তা অনন্য।
উদ্দীপক-২-এও আমবাগিচার তলায় নুরু, পুশি, শফিদের মেতে ওঠা এবং বৈশাখের দুপুরে ঘুমাতে না গিয়ে শখের রান্নার ধুম পড়ার মাধ্যমে অবিকল সেই গ্রামীণ শৈশবকেই তুলে ধরা হয়েছে।
দারিদ্র্যের ছায়া থাকলেও অপু-দুর্গার জীবনে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে শৈশবকে উপভোগ করার দিকটিই গল্পে প্রধান। সুতরাং, উদ্দীপক-২-এর ভাববস্তুই 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের মূল সুর হিসেবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
বাক্প্রতিবন্ধী কন্যা সুভার ভবিষ্যৎ ও সমাজ নিয়ে পিতা-মাতার অন্তরে যে প্রতিনিয়ত এক গভীর ও অপ্রকাশিত দুশ্চিন্তার পাহাড় জমে থাকত, তা বোঝাতেই উক্তিটি করা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভা' গল্পে সুভা কথা বলতে পারত না। সমাজ প্রতিবন্ধী মেয়েকে বোঝা মনে করত। সুভার পিতা বাণীকণ্ঠ ও মাতা সর্বদা লোকলজ্জা এবং মেয়ের অনাগত দিন নিয়ে এক নীরব মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতেন। সবার সামনে এই দুঃখ প্রকাশ না পেলেও তাঁদের বুকের ভেতর এক অদৃশ্য বিষাদের ভার সর্বদা চেপে থাকত।
উদ্দীপকের রাতুলের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং একা একা বসে থেকে মনে কষ্ট পাওয়ার সাথে 'সুভা' গল্পের সুভার বাক্প্রতিবন্ধিতা ও নিঃসঙ্গ বেদনার সাদৃশ্য রয়েছে।
'সুভা' গল্পে বাক্প্রতিবন্ধী সুভা অন্য সাধারণ ছেলেমেয়েদের মতো কথা বলতে বা খেলতে পারত না বলে সমবয়সীরা তার সাথে মিশত না। সে একা একা নদীর ঘাটে কিংবা তেঁতুলতলায় বসে থাকত এবং নিজের অক্ষমতার কথা ভেবে গোপনে চোখের জল ফেলত।
উদ্দীপকের রাতুলও পায়ে ফোলা সমস্যার কারণে অন্যদের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না এবং পথের ধারে একা বসে কষ্ট পায়।
সুতরাং, শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সমবয়সীদের থেকে পিছিয়ে পড়ে একাকীত্ব ও অন্তর্বেদনা অনুভব করার দিক থেকে রাতুল ও সুভার মাঝে সুস্পষ্ট সাদৃশ্য বিদ্যমান।
না, উদ্দীপকের তুহিন স্যারকে 'সুভা' গল্পের সুভার বাবার সার্থক প্রতিনিধি বলা যায় না; বরং তুহিন স্যার সুভার বাবার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও বাস্তবমুখী মানবিক চেতনার অধিকারী।
'সুভা' গল্পে বাণীকণ্ঠ সুভাকে স্নেহ করতেন ঠিকই, কিন্তু তিনি ছিলেন সমাজের প্রথার কাছে নতজানু। তিনি কখনো সুভার প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য কোনো বাস্তব চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেননি; বরং সমাজের লোকলজ্জা থেকে বাঁচতে গোপনে সুভাকে কলকাতায় নিয়ে এমন পাত্রে বিয়ে দেন যারা সুভার বোবা হওয়ার কথা জানত না। তিনি সুভার ভবিষ্যৎকে এক গভীর ট্র্যাজেডির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে, উদ্দীপকের তুহিন স্যার রাতুলের সমস্যা দেখে কেবল আবেগ প্রকাশ করেননি; তিনি নিজে তাকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে গেছেন এবং চিকিৎসার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা করার জন্য অভিভাবকের সাথে কথা বলেছেন।
যেখানে সুভার বাবা ছিলেন নিষ্ক্রিয় ও দায়িত্ব এড়ানো পিতা, সেখানে তুহিন স্যার হলেন সক্রিয়, দূরদর্শী ও সহানুভূতিশীল সমাজসংস্কারক। অতএব, তুহিন স্যার সুভার বাবার প্রতিনিধি নন, বরং তাঁর চেয়ে অনেক উন্নত আদর্শের প্রতীক।
হজরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরই নির্ভীক সাহসিকতায় প্রকাশ্যে কাবা প্রাঙ্গণে প্রথম আজান ধ্বনিত হয়েছিল এবং মুসলমানদের মুক্তকণ্ঠে নামাজের সূচনা হয়েছিল বলে আজানের সাথে তাঁর স্মৃতি জড়িত।
ইসলামের সূচনালগ্নে পৌত্তলিক কুরাইশদের অত্যাচারে মুসলমানরা গোপনে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু বীর উমরের ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলিম সমাজে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়। তাঁরই উপস্থিতিতে হজরত বিলাল (রা.) প্রকাশ্যে রাজপথে দাঁড়িয়ে তাওহিদের আজান দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের কারণেই আজানের স্মৃতির সাথে উমরের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
উদ্দীপকের চেয়ারম্যান কুদ্দুস আলী ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হক নষ্ট করার দিক থেকে 'উমর ফারুক' কবিতার ত্যাগী ও ন্যায়পরায়ণ হজরত উমরের সাথে সম্পূর্ণ বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
'উমর ফারুক' কবিতায় খলিফা উমর ছিলেন চরম নির্লোভ ও প্রজাদরদি এক মহান শাসক। তিনি সরকারি ত্রাণ সুষমভাবে বণ্টন করতেন এবং নিজের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা স্বজনপ্রীতি প্রশ্রয় দিতেন না।
পক্ষান্তরে, উদ্দীপকের কুদ্দুস আলী চেয়ারম্যান সরকারি সাহায্য নিজের আত্মীয়দের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে দরিদ্রদের বঞ্চিত করেছেন। ক্ষমতার এমন অসদুপায় ও লোভ খলিফা উমরের সুবিচারের দর্শনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক ও বিপরীতমুখী।
মূল্যায়নটি সম্পূর্ণ যথার্থ। উদ্দীপকের রাকিব সাহেবের নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার, অপরাধীকে ছাড় না দেওয়া এবং সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান 'উমর ফারুক' কবিতার হজরত উমর (রা.)-এর ন্যায়ের শাসনের আদর্শকেই প্রতিফলিত করে।
কাজী নজরুল ইসলামের 'উমর ফারুক' কবিতায় দেখা যায়, খলিফা উমর ন্যায়ের দণ্ড ধারণ করার সময় কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি বা আত্মীয়তার তোয়াক্কা করতেন না। তিনি ছিলেন দুর্বল ও শোষিতের জন্য বর্ম আর দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীর জন্য সাক্ষাৎ যমদূত।
উদ্দীপকের রাকিব সাহেবও কোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবশালীর ভয়ে পিছু হটেননি; তিনি চেয়ারম্যানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করেছেন এবং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।
অতএব, সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে অবিচল থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণের দিক থেকে রাকিব সাহেবের কর্মকাণ্ড খলিফা উমরের ন্যায়বিচারের ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন।
উদ্দীপক-১:
ঘরহীন ওরা, ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ি দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ?
উদ্দীপক-২:
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে,
বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসম্মানে সাদা দুধে-ভাতে।
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,
সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ
সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।
জলপাই রঙের ট্যাঙ্কগুলো নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এবং শহরের পর শহর ধ্বংস করেছিল বলে এদের দানবের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
শামসুর রাহমানের 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় একাত্তরে পাকিস্তানি জান্তার সামরিক নৃশংসতাকে চিত্রিত করা হয়েছে। ট্যাঙ্ক নিয়ে হানাদাররা দানবের মতো উন্মত্ত উল্লাসে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ঘরে ঘরে আগুন দেয় ও গণহত্যা চালায়। দানবের হিংস্রতা ও মানবতাহীন ধ্বংসলীলার প্রতীক হিসেবেই সামরিক ট্যাঙ্ককে দানব বলা হয়েছে।
উদ্দীপক-১-এ যুদ্ধের ভয়াবহতা, গৃহহারা মানুষের অনিদ্রা এবং মাথার ওপর বোমারু বিমানের ত্রাসের সাথে 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় বর্ণিত পাকিস্তানি আগ্রাসনের বিভীষিকা সাদৃশ্যপূর্ণ।
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কীভাবে কালরাত্রির পর শহর ও গ্রামগুলো শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। বুলেটের আঘাত, অগ্নিকাণ্ড এবং নিরীহ মানুষের আশ্রয়হীন হয়ে ছোটাছুটি করার দৃশ্য কবিতায় ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপক-১-এও রক্তে পবিত্র ভূমি ভেজা, ঘরহারা মানুষের কালোরাতের আতঙ্ক এবং ধ্বংসের যে আর্তনাদ বর্ণিত হয়েছে, তা কবিতার সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। উদ্দীপক-২-এ স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি শোষণহীন, ক্ষুধামুক্ত, গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে, তা-ই মূলত 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতার মূল চেতনা।
শামসুর রাহমানের কবিতাটিতে বাঙালি জাতি কেবল একটি ভূখণ্ড বা পতাকা পাওয়ার জন্য রক্ত দেয়নি; তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এমন এক মুক্ত স্বদেশ যেখানে কৃষক মনুমিয়া দুধে-ভাতে বাঁচবে, অনাথ শিশুরা মর্যাদা পাবে এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠবে।
উদ্দীপক-২-এ ঠিক সেই স্বপ্নের কথাই বলা হয়েছে— যেখানে যৌথ খামারের সমৃদ্ধি, শ্রমিকের মুখে হাসি এবং শিশুর দুধে-ভাতে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি থাকবে।
সুতরাং, বাঙালির দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের আসল স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের সার্থকতা হলো এই শোষণমুক্ত মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই কারণেই উদ্দীপক-২ কবিতার গভীরতম চেতনাকেই ধারণ করে।
উদ্দীপক-১:
সংসার সাগর মাঝে দুঃখ তরঙ্গের খেলা
আশা তার একমাত্র ভেলা।
উদ্দীপক-২:
মানুষ আসে, মানুষ যায়, ক্ষণিক এই জীবন
তবু রবে প্রকৃতি, রবে তার সৃজন।
ফুল ফোটে, পাখি গায়, ভরে ওঠে আলো,
সৌন্দর্যের সুর বাজে চিরন্তন ভালো।
অতীতের পরাক্রমশালী ও অহংকারী মানবসভ্যতাগুলো যেমন একদিন ধ্বংস হয়ে ধুলোয় মিশে গেছে, তেমনি বর্তমানের মানবজাতিও একদিন বিলীন হয়ে যাবে— একথাই বোঝানো হয়েছে।
জীবনানন্দ দাশের 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল প্রতিপাদ্য হলো মানবসভ্যতার ক্ষণস্থায়িত্ব। প্রাচীন এশিরিয়া ও ব্যাবিলন সাম্রাজ্য একসময় অত্যন্ত প্রতাপশালী ছিল, কিন্তু আজ তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই; তারা কেবল ধ্বংসাবশেষ ও ধুলো-ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। সভ্যতার অহংকার ও মানুষের ক্ষমতার নশ্বরতা প্রকাশ করতেই কবি এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত টেনেছেন।
উদ্দীপক-১-এ মানুষের পার্থিব সংসার ও দুঃখের সাগরে বাঁচার আকুলতার যে চিত্র রয়েছে, তা 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মানবজীবনের নশ্বরতা ও দুঃখের ঊর্ধ্বে প্রকৃতির নির্লিপ্ত প্রশান্তির দর্শনের সাথে সম্পর্কিত।
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে মানুষ তার দুঃখ, আশা ও বেদনা নিয়ে অনন্তকাল বাঁচতে পারে না। মৃত্যুর সাথে সাথে মানুষের সমস্ত সুখ-দুঃখের অবসান ঘটে।
উদ্দীপক-১-এও সংসারকে দুঃখের তরঙ্গ এবং আশাকে বেঁচে থাকার একমাত্র ভেলা হিসেবে উল্লেখ করে মানবজীবনের সংগ্রাম ও অপূর্ণতাকে তুলে ধরা হয়েছে। উভয়ের মধ্যেই মানুষের দুঃখময় জীবনের সীমাবদ্ধতা স্বীকৃত হয়েছে।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ। উদ্দীপক-২-এ মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের বিপরীতে প্রকৃতির শাশ্বত রূপ ও সৌন্দর্য সৃষ্টির অমরতার যে জয়গান গাওয়া হয়েছে, তা-ই মূলত 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল দর্শন।
জীবনানন্দ দাশ কবিতায় ব্যক্ত করেছেন যে, ব্যক্তি মানুষ একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে এবং তার মৃত্যুতে এই পৃথিবীর কিছুই থেমে থাকবে না। চালতাফুল তেমনি স্নিগ্ধ গন্ধ বিলাবে, লক্ষ্মীপেঁচা গান গাইবে এবং প্রকৃতির চিরন্তন শোভা অমলিন থাকবে।
উদ্দীপক-২-এ অবিকল এই সত্যটিই উচ্চারিত হয়েছে— 'মানুষ আসে, মানুষ যায়, ক্ষণিক এই জীবন / তবু রবে প্রকৃতি, রবে তার সৃজন'।
অতএব, প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য ও অবিনশ্বরতার যে সত্য কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় রূপায়িত করেছেন, উদ্দীপক-২ ঠিক সেই ভাবাদর্শকেই যথাযথভাবে প্রকাশ করেছে।
মৃত্যুর মুখে পতিত শাহজাদা হুমায়ুনের চারপাশে চিকিৎসকদের অপারগতা ও স্তব্ধতা পিতার জন্য চরম যন্ত্রণাদায়ক ছিল বলে কবি নীরবতাকে নিষ্ঠুর বলেছেন।
গোলাম মোস্তফার 'জীবন বিনিময়' কবিতায় দেখা যায়, কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হুমায়ুনের জীবনের আশা চিকিৎসকরা ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রাসাদের সকলে নীরবে মৃত্যুর ক্ষণ গুনছিল। পুত্রের চরম বিপদে কারও কোনো সান্ত্বনা বা প্রতিকার না থাকার এই নিস্তব্ধতা পিতা বাবরের অন্তরে চাবুকের মতো আঘাত করছিল। তাই তিনি এই নিস্তব্ধতাকে নিষ্ঠুর আখ্যা দিয়েছেন।
উদ্দীপকের সজীবের পরিবারের চরম দারিদ্র্য, ছেঁড়া পর্দা ও চুইয়ে পড়া টিনের চালের সাথে 'জীবন বিনিময়' কবিতার সম্রাট বাবরের রাজকীয় ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত প্রাসাদের বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
'জীবন বিনিময়' কবিতার প্রেক্ষাপট হলো মুঘল সাম্রাজ্যের রাজপ্রাসাদ, যেখানে ধনসম্পদ, মণিমুক্তা ও দাসদাসী পরিবেষ্টিত পরিবেশ ছিল।
পক্ষান্তরে, উদ্দীপকের সজীবের পরিবারটি এক নিঃস্ব দরিদ্র পরিবার যেখানে ঝুপড়ি ঘরে টিনের চাল চুইয়ে জল পড়ে এবং ওষুধের টাকা জোগাতে পিতাকে নিজের শরীরের রক্ত বিক্রি করতে হয়।
অতএব, রাজকীয় প্রাচুর্য এবং চরম ছিন্নমূল দারিদ্র্যের পার্থক্যের দিক থেকেই সজীবের পরিবারের সাথে বাবরের পারিবারিক অবস্থার সুস্পষ্ট বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।
মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যথার্থ। সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য থাকলেও সন্তানের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্দীপকের রাশেদ এবং সম্রাট বাবরের পিতা হিসেবে অপত্য স্নেহ ও ত্যাগ একসূত্রে গাঁথা।
'জীবন বিনিময়' কবিতায় সম্রাট বাবর মুঘল সিংহাসনের সমস্ত মায়া ত্যাগ করে মুমূর্ষু পুত্র হুমায়ুনের রোগশয্যা প্রদক্ষিণ করে আল্লাহর দরবারে নিজের জীবনের বিনিময়ে পুত্রের জীবনভিক্ষা চেয়েছিলেন। তাঁর সেই দোয়া কবুল হয়েছিল— হুমায়ুন সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং বাবর মৃত্যুবরণ করেন।
উদ্দীপকের দরিদ্র পিতা রাশেদও সন্তান সজীবকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের শরীরের রক্ত বিক্রি করেন এবং সন্তানকে নবজীবন দিয়ে নিজে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাঁর মুখে ছিল বিজয়ের এক নির্মল তৃপ্তি।
সম্রাট বাবর বা সাধারণ রাশেদ— পিতা হিসেবে তাঁদের সন্তানের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আত্মোৎসর্গের মহিমা স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে চিরন্তন এক শাশ্বত রূপ ধারণ করেছে। সুতরাং, তাঁদের সন্তানবাৎসল্য নিশ্চিতভাবেই একসূত্রে গাঁথা।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে অনুফা মীর আলির ওপর বিরক্ত হয়েছিল কারণ পাকিস্তানি হানাদারদের চরম আগ্রাসনের মুখে যখন দ্রুত আত্মরক্ষা ও মোকাবিলার পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য ছিল, তখন মীর আলির অতিরিক্ত দ্বিধাগ্রস্ততা ও অলস কালক্ষেপণ সে সহ্য করতে পারেনি।
অনুফা ছিল একজন বাস্তববাদী ও চটপটে গ্রামীণ তরুণী। সে জানত যে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে ঢুকলে কারও কোনো ক্ষমা নেই। সেখানে মীর আলি বার্ধক্য ও ভয়ের কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না এবং এক জায়গায় অসাড়ের মতো বসেছিলেন। বিপদের মুহূর্তে এমন অহেতুক জড়তা জীবনকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয় বলেই অনুফা মীর আলির ওপর ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছিল।
না, '১৯৭১' উপন্যাসের রফিক চরিত্রটি কোনোভাবেই দ্বিমুখী চরিত্র নয়; বরং সে একজন দূরদর্শী, কৌশলী ও দেশপ্রেমে নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা।
রফিক মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল হিসেবে আপাতদৃষ্টিতে শত্রুপক্ষ ও রাজাকারদের সাথে সতর্ক যোগাযোগ বজায় রাখত যাতে তাদের গতিবিধি ও গোপন পরিকল্পনা আগে থেকেই জেনে ফেলা যায়। এটি ছিল যুদ্ধের একটি আধুনিক গেরিলা কৌশল (ইন্টেলিজেন্স)। রফিকের মূল আনুগত্য সবসময়ই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিবাহিনীর প্রতি। সে নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহ করত এবং সঠিক সময়ে হানাদারদের ওপর আঘাত হানত। তাই তার এই কৌশলগত আচরণকে দ্বিমুখী না বলে রণকৌশলগত প্রজ্ঞা বলাই সমীচীন।
মেজর এজাজের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লেগেছিল কারণ সে বাঙালিদের শান্ত জনপদে যে অতর্কিত প্রতিরোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা আক্রমণের মুখে পড়েছিল, তাতে তার নিশ্চিত পরাজয় ও মৃত্যুর চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল।
মেজর এজাজ ভেবেছিল অস্ত্র দিয়ে অতি সহজেই নীলগঞ্জ গ্রাম ও বাঙালিদের পদানত করা যাবে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর অসীম সাহস, গেরিলা আক্রমণ এবং সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অসহযোগিতা দেখে সে হতচকিত হয়ে পড়ে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার ভেঙে পড়া এবং যে কোনো মুহূর্তে বিদ্রোহীদের গুলিতে প্রাণ হারানোর গভীর স্নায়ুচাপ থেকেই তার কপালে আতঙ্কের ঘাম জমে উঠেছিল।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে ইমাম সাহেব চরিত্রটি হলো ধর্মকে ব্যক্তিস্বার্থ ও রাজনৈতিক শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারকারী এক ভণ্ড ও সুবিধাবাদী চরিত্রের প্রতীক।
ইমাম সাহেব ধর্মের নামে শান্তি ও ন্যায়ের কথা বললেও বাস্তবে সে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের সাথে আঁতাত করে চলত। সে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করত এবং হানাদারদের গণহত্যা ও বর্বরতাকে ধর্মীয় লেবাসে জায়েজ করার অপচেষ্টা চালাত। দেশপ্রেম ও মানবতার বিপরীতে নিজের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। অর্থাৎ সুবিধাবাদ ও মোনাফেকির এক বাস্তব রূপ হলো এই ইমাম চরিত্র।
বদিউজ্জামান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ এবং নির্যাতনের হাত থেকে নিজের প্রাণ রক্ষা করার জন্য আত্মগোপন করেছিল।
বদিউজ্জামান ছিল নীলগঞ্জ গ্রামের একজন সচেতন মানুষ যার ওপর পাকিস্তানি দোসরদের কড়া নজর ছিল। ২৫শে মার্চের পর যখন গ্রামে গ্রামে তালিকা করে মুক্তিকামী ও সচেতন মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করা শুরু হয়, তখন কোনো প্রকাশ্য প্রতিরোধ গড়ার সুযোগ না পেয়ে আত্মরক্ষা এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে সে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছিল।
“অপমানের চেয়ে মানুষ মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে”— '১৯৭১' উপন্যাসের আজিজ মাস্টার চরিত্রটি আত্মমর্যাদাবোধ, দেশপ্রেম ও আপসহীন চেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আজিজ মাস্টার ছিলেন গ্রামের এক আদর্শবান শিক্ষক। পাকিস্তানি হানাদাররা যখন তাঁকে আটক করে দেশের বিরুদ্ধে কথা বলতে, ক্ষমা চাইতে এবং পাকিস্তানিদের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করতে বাধ্য করার চেষ্টা করে, তখন তিনি কাপুরুষের মতো নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেননি। তিনি জানতেন মাথা নত করলে হয়তো ক্ষণিকের জন্য প্রাণ বাঁচবে, কিন্তু তা হবে আজীবনের দাসত্ব ও চরম অপমান। তাই তিনি হানাদারদের অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে গৌরবের সাথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কাছে সম্মানের চেয়ে জীবনের মূল্য বড় নয়।
মেজর এজাজ কোনো ন্যায়পরায়ণতা বা আইনি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং নিজের দখলদারিত্বের ক্ষমতা প্রদর্শন করা, গ্রামবাসীকে ভয় দেখানো এবং গণহত্যার একটি মিথ্যা বৈধতা তৈরির কূটকৌশল হিসেবে খুনের বিচারে অতি-উৎসাহী হয়েছিল।
মেজর এজাজ চেয়েছিল বিচারের প্রহসন সাজিয়ে গ্রামের বিশিষ্ট ও প্রতিবাদী ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলতে যাতে কেউ ভবিষ্যতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ার সাহস না পায়। নিজের বর্বরতাকে ন্যায়বিচারের মোড়কে ঢেকে বিশ্বকে দেখানোই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। তাই এই বিচারপ্রীতি ছিল প্রকৃতপক্ষে শোষণের এক মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র।
“নীলগঞ্জ আসলে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি”— উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর যে ধ্বংসযজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের যে সম্মিলিত প্রতিরোধ ঘটেছিল, নীলগঞ্জ গ্রামটি তারই এক ক্ষুদ্র প্রতীকী রূপ।
১৯৭১ সালে বাংলার প্রতিটি গ্রামেই পাকিস্তানি হানাদাররা ঢুকে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল, নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল এবং নারীদের লাঞ্ছিত করেছিল। আবার একই সাথে প্রতিটি গ্রামের তরুণরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, মায়েরা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও খাবার দিয়েছিল এবং সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে হানাদারদের রুখে দাঁড়িয়েছিল। নীলগঞ্জ গ্রামের প্রতিটি ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্রকেই নিখুঁতভাবে ধারণ করেছে।