অংশ-১ :
দেহের খাদ্য ভাত ও রুটি
মনের খাদ্য কই?
খুঁজতে গিয়ে পাই যে আমি
নানান রকম বই।
অংশ-২ :
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।
সাহিত্যচর্চা মানুষের মনের সার্বিক বিকাশ ঘটায়, চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে এবং আত্মাকে আনন্দময় মুক্তি দেয় বলে একে শিক্ষার প্রধান অঙ্গ বলা হয়েছে।
প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'বই পড়া' প্রবন্ধে বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে কেবল প্রয়োজনীয় বৈষয়িক জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু তার আত্মিক চোখ খুলে দিতে পারে না। সাহিত্যের সান্নিধ্যেই মানুষ আনন্দ লাভ করে এবং নিজের বুদ্ধি ও কল্পনাকে প্রসারিত করতে শেখে। তাই মনের মুক্তি ও মানবিক পূর্ণতার জন্য সাহিত্যচর্চাকে শিক্ষার শ্রেষ্ঠ ও প্রধান অঙ্গ বিবেচনা করা হয়।
উদ্দীপকের অংশ-১-এ দেহের খাদ্যের পাশাপাশি মনের খোরাক মেটাতে নানারকম বই পড়ার যে অপরিহার্যতা তুলে ধরা হয়েছে, তা 'বই পড়া' প্রবন্ধে বর্ণিত মনের ক্ষুধা নিবারণে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
'বই পড়া' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক বলেছেন, মানুষ কেবল অন্নবস্ত্র নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না; মানুষের মনকে সতেজ ও সজীব রাখার জন্য জ্ঞান ও সাহিত্যের খোরাক দরকার। বই পড়াই হলো মানুষের মনের সেই সঞ্জীবনী সুধা যা তাকে আত্মিক তৃপ্তি দেয়।
উদ্দীপকের অংশ-১-এও দেহের খাদ্যের সাথে তুলনা করে মনের খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন ধরনের বইকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা প্রবন্ধের ভাববস্তুকেই সমর্থন করে।
হ্যাঁ, সাহিত্যবিমুখ মানুষের মানসিক দাসত্ব ও আত্মিক অপমৃত্যুর প্রতি লেখকের ক্ষোভ ও সতর্কবাণী উদ্দীপকের অংশ-২-এ অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রমথ চৌধুরী 'বই পড়া' প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, যারা সাহিত্যচর্চা থেকে দূরে থাকে, তারা নিজেদের আত্মাকে অন্ধ করে রাখে। তারা সমাজের প্রচলিত সংকীর্ণতার গোলামে পরিণত হয় এবং জীবনের বৃহত্তর আনন্দ ও মানবিক উদারতা থেকে বঞ্চিত হয়।
উদ্দীপকের অংশ-২-এ কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বিখ্যাত চরণের প্রতিধ্বনি করে বলা হয়েছে— যে কবিতা ভালোবাসে না, সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে এবং আজীবন মানসিক ক্রীতদাস থেকে যাবে।
সাহিত্যহীন জীবনের এমন পঙ্গুত্ব ও বন্ধ্যাত্বের দিকটি প্রবন্ধে ও উদ্দীপকে অভিন্ন ভাষায় উচ্চারিত হয়েছে। সুতরাং, উদ্দীপকের অংশ-২ সাহিত্যবিমুখদের করুণ পরিণতির বিষয়ে লেখকের মূল বক্তব্যকেই ধারণ করেছে।
অংশ-১ : মৃত্যুপথযাত্রী ইমাম হাসান তাঁর বিষদাতার পরিচয় জানতে পেরেও প্রতিশোধ নেননি, বরং তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমাকে বড়ই ভালোবাসিতাম, বড়ই স্নেহ করিতাম, তাহার উপযুক্ত কার্যই তুমি করিয়াছ। তোমার চক্ষু হইতে হাসান বিদায় হইতেছে। সুখে থাকো, তোমাকে আমি ক্ষমা করিলাম।”
অংশ-২ : সম্রাট আওরঙ্গজেব নিজ জীবনে বিলাসিতা পরিহার করে চলতেন। রাজকোষ থেকে অর্থ না নিয়ে নিজ হাতে কুরআন শরিফের প্রতিলিপি তৈরি করতেন এবং তার বিক্রয়ালব্ধ অর্থ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মহানবী (স.)-এর ওফাতলগ্নে হজরত আবু বকর (রা.) শোকাহত উম্মতকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে মানুষ মরণশীল এবং সবাইকে একদিন আল্লাহর সান্নিধ্যে ফিরে যেতে হবে— একথাই বোঝানো হয়েছে।
মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর 'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে দেখা যায়, মহানবীর মৃত্যুর পর সাহাবিরা চরম শোকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখন হজরত আবু বকর (রা.) গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করেন, যারা মুহম্মদ (স.)-এর পূজা করত তারা জানুক তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু যারা আল্লাহর ইবাদত করে তারা জানুক আল্লাহ চিরঞ্জীব। প্রত্যেক নশ্বর মানবসন্তানকেই মৃত্যুর মাধ্যমে আল্লাহর দিকে মহাযাত্রা করতে হবে।
উদ্দীপকের অংশ-১-এ ইমাম হাসান (রা.) কর্তৃক বিষদাতাকে প্রতিশোধ না নিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেওয়ার মাঝে 'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে বর্ণিত মহানবীর চরম ক্ষমাশীলতা ও অসীম ক্ষমার মহৎ গুণটি প্রকাশ পেয়েছে।
'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে দেখা যায়, তায়িফের কাফেররা মহানবীকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করেছিল এবং মক্কার কুরাইশরা তাঁকে আজীবন নির্যাতন করেছিল। কিন্তু মক্কা বিজয়ের দিন তিনি সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং তায়িফে অভিশাপ না দিয়ে তাদের কল্যাণের জন্য দোয়া করেছিলেন।
উদ্দীপকের ইমাম হাসানও মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে নিজের হত্যাকারীকে ভালোবেসে ক্ষমা করে দিয়ে তাঁর পরম পিতামহ মহানবী (স.)-এর সেই অতুলনীয় ক্ষমার আদর্শকেই সমুন্নত রেখেছেন।
না, উদ্দীপকের অংশ-২ 'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধের সামগ্রিক দিক ধারণ করতে পারেনি; এটি কেবল মহানবীর অনাড়ম্বর ও ত্যাগী জীবনের একটি খণ্ডাংশকে ধারণ করেছে মাত্র।
'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে মহানবীর চরিত্রকে বহু বর্ণিল বৈশিষ্ট্যে চিত্রিত করা হয়েছে। সেখানে যেমন রয়েছে তাঁর পার্থিব নির্লোভ ও সাধাসিধে জীবনযাপন, তেমনি রয়েছে তাঁর নিরপেক্ষ বিচারবোধ, অসীম বীরত্ব, গভীর মানবপ্রেম, নারীদের মর্যাদা রক্ষা, দাসদের মুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মতো বহুবিধ অনন্য গুণাবলি। তিনি ছিলেন একাধারে রাষ্ট্রনায়ক, সেনাপতি ও পরম দয়ালু নবী।
উদ্দীপকের অংশ-২-এ কেবল সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিলাসিতা বর্জন ও স্বহস্তে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহের চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে। এটি মহানবীর কৃচ্ছ্রসাধনের সাথে মিললেও তাঁর সমগ্র জীবনের বিশাল ক্যানভাসকে তুলে ধরতে সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত।
অতএব, উদ্দীপকের অংশ-২ প্রবন্ধের অন্যতম একটি বিশেষ দিক নির্দেশ করলেও তার সামগ্রিক ভাবকে ধারণ করতে পারেনি।
আবদুর রহমানের অফুরন্ত শক্তি, প্রভুভক্তি এবং যেকোনো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার চরম আনুগত্য ও সামর্থ্য বোঝাতেই এ কথা বলা হয়েছে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর 'প্রবাস বন্ধু' রচনায় আবদুর রহমান ছিলেন এক বিশালদেহী আফগান ভৃত্য। তার শারীরিক গঠন যেমন ছিল দানবীয়, তেমনি মনিবের প্রতি তার নিষ্ঠা ছিল প্রশ্নাতীত। সে লেখকের সেবায় জুতো পালিশ থেকে শুরু করে প্রয়োজনে যেকোনো অসাধ্য সাধন বা চরম লড়াই করতেও প্রস্তুত ছিল। তার এই নিরঙ্কুশ সেবা ও শক্তির ব্যাপ্তি বোঝাতেই এ রসাত্মক উক্তিটি করা হয়েছে।
উদ্দীপকে রাঙামাটির পাহাড়ি প্রকৃতি, ঝরনা ও প্রাকৃতিক রূপসৌন্দর্যের যে মুগ্ধকর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার সাথে 'প্রবাস বন্ধু' ভ্রমণ কাহিনিতে আফগানিস্তানের কাবুলের বরফাবৃত পাহাড় ও প্রকৃতির চিত্র সাদৃশ্যপূর্ণ।
'প্রবাস বন্ধু' রচনায় লেখক কাবুলের পাহাড়ি উপত্যকা, খাজা চাহলতন ও পাগমানের বরফে ঢাকা পাহাড়ের শুভ্র সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বিদেশের মাটির সেই মনোমুগ্ধকর পাহাড়ি প্রকৃতি লেখকের মনকে রোমাঞ্চিত করেছিল।
উদ্দীপকের তাকিয়াও রাঙামাটির পাহাড়, নদী ও শুভলং ঝরনার প্রাকৃতিক শোভা দেখে একইভাবে পুলকিত হয়েছে। পার্বত্য প্রকৃতির অনিন্দ্যসুন্দর রূপের প্রতি এই মুগ্ধতার দিক থেকেই উভয় বর্ণনার মাঝে গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
মন্তব্যটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও নির্ভুল। উদ্দীপকে কেবল তাকিয়ার স্বল্পকালীন পার্বত্য ভ্রমণের ভালো লাগাটুকু প্রকাশ পেলেও লেখকের কাবুলের বিচিত্র ও গভীর অভিজ্ঞতার তুলনায় এটি একটি খণ্ডিত রূপায়ণ মাত্র।
'প্রবাস বন্ধু' রচনায় সৈয়দ মুজতবা আলীর অভিজ্ঞতা কেবল পর্যটকের দৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। কাবুলে অবস্থানকালে তিনি আফগান সংস্কৃতির ভেতর প্রবেশ করেছিলেন, আফগানদের অদ্ভুত খাদ্যরীতি (বিশাল ভুরিভোজ), কনকনে শীতের বাস্তবতা এবং সর্বোপরি আবদুর রহমানের মতো একজন বিশালদেহী ও শিশুর মতো সরল আফগান ভৃত্যের অবিশ্বাস্য আতিথেয়তা ও আত্মিক বন্ধনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এতে হাস্যরস ও মানবচরিত্রের গভীর রূপায়ণ ঘটেছে।
উদ্দীপকে তাকিয়ার অভিজ্ঞতা একটি সাধারণ শিক্ষা সফর বা ভ্রমণের অনুভূতিমাত্র। এতে লেখকের কাবুলের মতো গভীর নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক ও মানবিক অভিজ্ঞতার জটিল বিস্তৃতি নেই।
সুতরাং, উদ্দীপকের অভিজ্ঞতা লেখকের কাবুলবাসের বহুস্তরবিশিষ্ট রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার তুলনায় কেবল একটি ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত প্রকাশ।
(i) ঝড়ের রাত্রে, বৈশাখী দিনে, বর্ষার দুর্দিনে
অভিযাত্রিক। নির্ভীক তারা পথ লয় ঠিক চিনে।
(ii) ভেবো না গো মা, তোমার ছেলেরা হারিয়ে গিয়েছে পথে
ওরা আছে মাগো হাজার মনের বিপ্লবী চেতনাতে।
তপুর দুই চোখে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং একটি শোষণহীন স্বাধীন ও সুন্দর স্বদেশের গভীর স্বপ্ন ও প্রত্যয় সবসময় খেলা করত বোঝাতে এ কথা বলা হয়েছে।
'একুশের গল্প'-এ তপু ছিল এক আদর্শবাদী ও স্বপ্নবান তরুণ। সে কেবল নিজের ভবিষ্যতের জন্য বাঁচেনি; তার দৃষ্টি ছিল জাতির মুক্তির সোনালী ভোরের দিকে। সেই মুক্ত ও আলোকিত স্বদেশ গড়ার গভীর আশা তার নিষ্পাপ দুটি চোখে সর্বদা স্বপ্নের আবেশ তৈরি করত।
উদ্দীপক (i)-এর ঝড়-তুফান ও বর্ষার দুর্দিনেও পথ চিনে এগিয়ে চলা নির্ভীক অভিযাত্রিকের সাথে 'একুশের গল্প' রচনার প্রতিবাদী তরুণ ভাষাশহিদ 'তপু' চরিত্রটির গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
'একুশের গল্প'-এ তপু ছিল এমন এক নির্ভীক সৈনিক যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ১৪৪ ধারা, পুলিশের রক্তচক্ষু ও বুলেটের ভয়কে উপেক্ষা করে বীরদর্পে মিছিলে এগিয়ে গিয়েছিল। কোনো প্রতিকূলতাই তাকে রুখতে পারেনি।
উদ্দীপক (i)-এও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে কোনো ভয় না পেয়ে সঠিক পথ চিনে এগিয়ে যাওয়া অভিযাত্রিকের যে রূপ আঁকা হয়েছে, তা তপুর অকুতোভয় সংগ্রামী চেতনার সাথেই সম্পূর্ণ মিলে যায়।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত। উদ্দীপক (ii)-এ শহিদ সন্তানদের হারিয়ে না যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিপ্লবী চেতনায় বেঁচে থাকার যে প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে, তা-ই মূলত 'একুশের গল্প'-এর মূল চেতনা।
'একুশের গল্প'-এ লেখক দেখিয়েছেন যে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে তপুদের আত্মাহুতি দিয়ে আন্দোলন শেষ হয়ে যায়নি। তাঁদের রক্ত বাংলার কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিবাদের মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছে। মায়েরা হয়তো তাঁদের সন্তানকে হারিয়ে কেঁদেছেন, কিন্তু সেই সন্তানরা কোটি তরুণের চেতনার আলো হয়ে অমরত্ব লাভ করেছে।
উদ্দীপক (ii)-এও সন্তানহারা মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হয়েছে যে ছেলেরা হারিয়ে যায়নি, তারা বিপ্লবের অনির্বাণ শিখা হয়ে বেঁচে আছে।
ভাষাশহিদদের এই অমরত্ব ও অবিনাশী জাতীয়তাবাদী জাগরণই একুশের গল্পের মূল সুর। সুতরাং, উদ্দীপক (ii) গল্পের মূল চেতনাকে সার্থকভাবে ধারণ করেছে।
(i) এ আমার শৈশবের নদী, এই জলের প্রান্তর
সারাদিন তার ভাঙা, পাকা ঘাট, মেলা স্রোত টানে।
কিছুই খুঁজিনি আমি যতবার এসেছি এ তীরে
নীরব তৃপ্তির জন্য আনমনে বসে থেকে ঘাসে
নির্মল বাতাস টেনে বুকভরা ডাকি এ বুক।
(ii) সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি
ও আমার বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি।
সুদূর ফ্রান্সে বসে নিঃসঙ্গ কবি জন্মভূমির কপোতাক্ষ নদের কাল্পনিক কলকল ধ্বনি শুনে নিজের ব্যাকুল মনকে সান্ত্বনা দেন বলে একে ভ্রান্তির ছলে কান জুড়ানো বলেছেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রবাসে তীব্র মাতৃভূমিবিরহে কাতর ছিলেন। বাস্তবে কাছে না পেলেও তিনি কল্পনায় প্রতিনিয়ত কপোতাক্ষ নদের স্রোতধ্বনি শুনতে পেতেন। কবি জানেন এটি তাঁর মনের একটি মায়াবী কল্পনা বা ভ্রম, তবুও সেই পরম স্মৃতির মায়াজালে আবদ্ধ থেকেই তিনি প্রবাসজীবনের তীব্র হাহাকার দূর করে হৃদয়কে শান্ত রাখতেন।
উদ্দীপক (i)-এ ফেলে আসা জন্মভূমির প্রিয় নদ-নদী ও তার শ্যামল তীরের প্রতি গভীর নস্টালজিয়া ও স্মৃতিকাতরতার সাথে 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার কবির নদের প্রতি স্মৃতিতাড়িত ভালোবাসার সাদৃশ্য রয়েছে।
'কপোতাক্ষ নদ' সনেটে কবি প্রবাসে বসে সাগরদাঁড়ির কপোতাক্ষ নদকে প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করেছেন। নদের স্বচ্ছ জলধারা ও তার তীরের স্মৃতি কবির হৃদয়কে সর্বদা আলোড়িত করে।
উদ্দীপক (i)-এও দূর প্রবাসে বসে স্বদেশের নদী ও তার মায়াবী জলপ্রবাহকে পরম ভালোবাসায় স্মরণ করার যে আবেগ ফুটে উঠেছে, তা কবির স্মৃতিকাতর অনুভূতির সাথেই সরাসরি সাদৃশ্যপূর্ণ।
না, উদ্দীপক (ii) 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার সমগ্র ভাবকে ধারণ করতে পারেনি; এটি কেবল প্রবাসজীবনের ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতার একটি আংশিক রূপ মাত্র।
'কপোতাক্ষ নদ' সনেটটি কেবল ব্যক্তিগত আকুলতার কবিতা নয়; এটি গভীর ও নিঃশর্ত এক স্বদেশপ্রেমের ক্লাসিক মহাকাব্য। কবিতায় অষ্টক ও ষটকের সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে কবি একদিকে নদের সাথে শৈশবের মাতৃদুগ্ধসম সম্পর্কের কথা বলেছেন, অন্যদিকে বিদেশের জমকালো নদীগুলোর প্রতি মোহভঙ্গের সত্য প্রকাশ করেছেন। পরিশেষে তিনি স্বদেশের মানুষের কাছে বিনম্র মিনতি জানিয়েছেন— যেন দেশমাতৃকা প্রবাসে থাকা এই ভুলো সন্তানকে চিরকাল স্নেহের বন্ধনে স্মরণ রাখে।
উদ্দীপক (ii)-এ কেবল ফিরে আসার একটি সাধারণ ইচ্ছে প্রকাশ পেয়েছে। এতে সনেটের শৈল্পিক দ্যোতনা, দেশমাতৃকার কাছে চিরন্তন ক্ষমাভিক্ষা ও সর্বজনীন আত্মোৎসর্গের যে মহিমান্বিত রূপ রয়েছে, তা অনুপস্থিত।
অতএব, উদ্দীপক (ii) কবিতার অন্যতম একটি অনুভূতির প্রকাশ ঘটালেও এর সামগ্রিক স্বদেশপ্রেম ও দার্শনিক ভাববস্তুকে স্পর্শ করতে পারেনি।
অর্ধপৃথিবীর শাসনকর্তা হওয়া সত্ত্বেও হজরত উমর (রা.) পার্থিব রাজপ্রাসাদের অহংকারে মগ্ন হননি এবং তাঁর ন্যায়বিচার ও বিনয় কখনো নত হয়নি বোঝাতে উক্তিটি করা হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর 'উমর ফারুক' কবিতায় খলিফা উমরের অনন্য চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর শাসনকালে কত বড় বড় সাম্রাজ্য ও রাজপ্রাসাদ ধুলোয় মিশে গেছে, তাঁর নিজের কুঁড়েঘর জীর্ণ হয়েছে, কিন্তু তাঁর সততা, ন্যায়দণ্ড ও মানবপ্রেমের সুউচ্চ আদর্শ কোনো শক্তির কাছে কখনোই মাথা নত করেনি।
উদ্দীপকের কামরান গৃহপরিচারককে সামান্য কারণে মারধর ও নির্যাতন করে 'উমর ফারুক' কবিতায় বর্ণিত আরবের অন্ধ অহংকারী ও অত্যাচারী কাফের-কুরাইশদের চরিত্রের সাথে সাদৃশ্য প্রদর্শন করেছে।
'উমর ফারুক' কবিতায় ইসলাম-পূর্ব অন্ধকার যুগে এবং যুগে যুগে সমাজের উদ্ধত শোষকদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যারা ভৃত্য বা দুর্বল মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করত এবং তাদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাত।
উদ্দীপকের কামরানও নিজের ক্ষমতার অহংকারে দুর্বল গৃহপরিচারকের সাথে অমানবিক আচরণ করে এবং তাকে কথায় কথায় মারধর করে। দুর্বলকে অবজ্ঞা ও নির্যাতন করার এই পঙ্কিল মানসিকতার দিক থেকেই কামরান অত্যাচারী চরিত্রের প্রতিচ্ছবি।
না, উদ্দীপকের আসাদুজ্জামান সাহেব দুর্বল ঠেলাগাড়ি চালককে সাহায্য করে এবং পরিচারকের ওপর নির্যাতন বন্ধে উদ্যোগী হয়ে প্রশংসনীয় কাজ করলেও তিনি কবিতায় বর্ণিত হজরত উমর (রা.)-এর সামগ্রিক চরিত্রের সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না।
'উমর ফারুক' কবিতায় খলিফা উমরের চরিত্র ছিল বহু অনন্য গুণের এক মহাকাব্যিক সমাহার। তিনি ছিলেন বিশ্বজয়ী সেনাপতি, অথচ খেজুর পাতার চাটাইয়ে শুয়ে সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটাতেন। তিনি বায়তুল মালের বোঝা নিজের কাঁধে বহন করতেন, জেরুজালেম যাত্রায় ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়িয়ে নিজে উটের রশি টেনেছিলেন এবং নিজ পুত্রের অপরাধেও সুবিচারের দণ্ড থেকে একচুল নড়েননি।
উদ্দীপকের আসাদুজ্জামান একজন ভালো ও পরোপকারী মানুষ যিনি সাধারণ দৈনন্দিন জীবনে একজন চালককে ঠেলতে সাহায্য করেছেন এবং ভাইকে তিরস্কার করেছেন। এটি একটি প্রশংসনীয় সামাজিক সদাচরণ হলেও খলিফা উমরের রাষ্ট্রনায়কোচিত সুবিচার, সীমাহীন আত্মত্যাগ ও বিশ্বজয়ী মহত্ত্বের তুলনায় নিতান্তই ক্ষুদ্র এক রূপ।
অতএব, আসাদুজ্জামানের মাঝে উমর ফারুকের পরোপকারী স্বভাবের কিয়দংশ প্রকাশ পেলেও তিনি তাঁর সমগ্র ঐতিহাসিক ও আত্মিক মহিমার পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না।
অংশ-১ :
বৈকালে কি বিকাশে
মাঠে-ঘাটে নামলে ঢল
ফিরে ফিরে ঢেউ দেয় ঘাসে। কল্পনায় সাদা হাঁস;
অংশ-২ :
বাহিরে নাহিরে ঝরঝর জল, গৃহগৃহ মেঘ ডাকে
এসবের মাঝে বুকে বুকে কেন যেন ব্যথা গুমরি ওঠে
যেন ও গুমর, গুমর চাহিয়া, দ্বার এ বুকের
বাদলের সাথে মিশিয়া গুমরে গুমরে কাঁদে।
উদ্দীপকের অংশ-১-এ মাঠে-ঘাটে ঢল নামা এবং ঘাসের ওপর জলের ঢেউ খেলে যাওয়ার মাধ্যমে 'বৃষ্টি' কবিতার পল্লীপ্রকৃতিতে বৃষ্টির রূপবদল ও সজীবতার দিকটি ফুটে উঠেছে।
শামসুর রাহমানের 'বৃষ্টি' কবিতায় দেখা যায়, গ্রীষ্মের শুষ্কতা দূর করে যখন বৃষ্টি নামে, তখন মাঠ-ঘাট জলে থইথই করে এবং তৃষ্ণার্ত প্রকৃতিতে প্রাণের হিল্লোল জেগে ওঠে। উদ্দীপকের অংশ-১-এও প্রকৃতির বুকে বৃষ্টির সেই সজীব ও তরল রূপের আবহ চিত্রিত হয়েছে।
উদ্দীপকের অংশ-২-এ ঝরঝর বৃষ্টির শব্দের সাথে সাথে মানবহৃদয়ে এক অজানা বিরহবেদনা ও গুমরে ওঠা কান্নার যে অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে, তা 'বৃষ্টি' কবিতায় বর্ণিত বর্ষার দিনে মানুষের মনের গভীর অন্তর্বেদনা ও স্মৃতিকাতরতার দিকটিকে নির্দেশ করে।
'বৃষ্টি' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, বৃষ্টি কেবল বাইরে ঝরে না, তা মানুষের অবচেতন মনেও এক গভীর আলোড়ন তোলে। দূর অতীতের স্মৃতি, অপ্রাপ্তির কষ্ট এবং হৃদয়ের গোপন হাহাকার বর্ষার ধারার সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়।
উদ্দীপকের অংশ-২-এও বাদলের ধারার সাথে বুকের ভেতরের অবরুদ্ধ কান্না ও গুমরে ওঠা ব্যথা প্রকাশ পেয়েছে, যা বৃষ্টির রোমান্টিক ও বিষাদময় মনস্তত্ত্বের সাথেই সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সঠিক ও যথার্থ। উদ্দীপক-২ কেবল বৃষ্টির বেদনাবিধুর ও বিষাদগ্রস্ত রূপকে তুলে ধরেছে, ফলে তা 'বৃষ্টি' কবিতার সার্বিক জীবনমুখী ও আনন্দময় মূলভাবকে স্পর্শ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
'বৃষ্টি' কবিতাটি কেবল অশ্রু বা বেদনার কবিতা নয়; এটি প্রকৃতির পুনর্জন্ম, কৃষকের আনন্দ, মাটির উর্বরতা এবং মানবজীবনের নবীন আশাবাদের এক অপূর্ব সঙ্গীত। কবিতায় বৃষ্টির আগমনকে বন্দনা করা হয়েছে এক পরম সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে— যা শুষ্ক পৃথিবীকে ভিজিয়ে জীবনের জয়গান গায়।
উদ্দীপক-২-এ কেবল হৃদয়ের গুমরে ওঠা কান্না, হতাশা ও যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে। এতে প্রকৃতির নবজাগরণ, মাটির স্নিগ্ধ রূপ কিংবা বৃষ্টির প্রাণদায়ী ইতিবাচক দর্শনের কোনো বহিঃপ্রকাশ নেই।
সুতরাং, উদ্দীপক-২ বৃষ্টির একটি একপেশে বিষাদময় অনুভূতি দেখালেও 'বৃষ্টি' কবিতার সার্বিক প্রাণচাঞ্চল্য ও জীবনঘনিষ্ঠ মূল চেতনাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
কবি কোনো স্বপ্নলোক বা অবাস্তব জগতে নয়, বরং অন্তরের গভীর ভালোবাসা ও চিরন্তন আত্মিক টানে এই জন্মভূমির শ্যামল মাটির সাথেই একাত্ম হয়ে আছেন বোঝাতে এ কথা বলেছেন।
আহসান হাবীবের 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার মূল ভাব হলো মাটির সাথে মানুষের নাড়ির টান। কবি বাস্তবতায় হয়তো সব জায়গায় দৃশ্যমান নন, কিন্তু তাঁর চেতনা, স্মৃতি ও আত্মা এই দেশের নদী, ফুল, পাখি ও ঘাসের সাথে চিরদিনের জন্য মিশে আছে। এই নিবিড় আত্মিক সংযোগকে কবি 'স্বাপ্নিক নিয়ম' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
উদ্দীপকে বিদেশে থেকেও শিহাবের শৈশবের কুয়াশাভেজা ভোর, ফসলের মাঠ ও বর্ষার নদীর স্মৃতিকাতরতার সাথে 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার কবির জন্মভূমির চিরচেনা প্রকৃতির সাথে নাড়ির সম্পর্কের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতায় কবি প্রমাণ করেছেন যে তিনি এই দেশের কোনো অতিথি বা পর্যটক নন; তিনি ধানের গন্ধ, শালিকের ডাক ও ভেজা মাটির চিরন্তন আপনজন।
উদ্দীপকের শিহাবও দূর প্রবাসে সফল জীবন কাটালেও তার মন পড়ে থাকে দেশের শান্ত পল্লীপ্রকৃতির কোলে। এই তীব্র স্বদেশানুরাগ ও প্রকৃতির চিরন্তন ভালোবাসার দিক থেকে উদ্দীপকটি কবিতার মূল সুরের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।
“দেশেই তো আমার শিকড়”— উদ্দীপকে শিহাবের এই উক্তিটি 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার মূল অস্তিত্ববাদী দর্শনের এক চমৎকার ও নিখুঁত প্রকাশ।
আহসান হাবীবের কবিতার মূল বক্তব্য হলো, মানুষ যতই দূরে যাক না কেন, যে মাটিতে সে জন্মগ্রহণ করেছে, যার আলো-বাতাস ও ধুলোবালিতে সে বড় হয়েছে, সেই জন্মভূমিই তার আসল অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়। কবি জোর দিয়ে বলেছেন যে তিনি এই দেশের কেউ নন এমনটি নয়, বরং তিনি এই মাটিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উদ্দীপকের শিহাবও স্ত্রীর প্রশ্নের মুখে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে বিদেশে প্রাচুর্য থাকলেও তাঁর আত্মপরিচয়ের শিকড় গাঁথা রয়েছে এই মাতৃভূমির বুকেই। শেকড়হীন মানুষ যেমন বাঁচতে পারে না, তেমনি জন্মভূমিকে ভুলে মানুষের কোনো পূর্ণাঙ্গ সত্তা থাকতে পারে না।
অতএব, শিহাবের উপলব্ধিটি কবিতার সেই চিরন্তন বক্তব্য— অর্থাৎ মাতৃভূমির সাথে মানুষের আত্মার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনকেই সার্থকভাবে বিশ্লেষণ ও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মেজর এজাজ আজিজ মাস্টারকে সৎলোক বলেছিল কারণ সে আজিজ মাস্টারের ব্যক্তিত্বের মাঝে কোনো ভণিতা, ভয় বা লোভ দেখেনি; বরং মাস্টারকে তাঁর শিক্ষকসুলভ নীতি ও আত্মমর্যাদায় অবিচল দেখে সে বাধ্য হয়ে এই সত্য স্বীকার করেছিল।
আজিজ মাস্টার ছিলেন গ্রামের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। পাকিস্তানি সামরিক অফিসার মেজর এজাজ বহু মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা সুবিধা দিয়ে বশ করতে পারলেও আজিজ মাস্টারের নিষ্কলঙ্ক চরিত্র ও নীতির কাছে সে হেরে গিয়েছিল। মাস্টার কোনো চাটুকারিতা করেননি এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। একজন নির্লজ্জ দখলদার হওয়া সত্ত্বেও মাস্টারের চারিত্রিক দৃঢ়তার কাছে মেজর এজাজ অন্তরে শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তাঁকে 'সৎলোক' বলতে বাধ্য হয়েছিল।
“দেশপ্রেমের চেতনা লুকিয়ে রাখা যায় না, তা প্রকাশ পায়”— '১৯৭১' উপন্যাসের রফিক চরিত্রটি এই সত্যের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি।
উপন্যাসে রফিক আপাতদৃষ্টিতে সতর্ক ও ধীরস্থির থাকলেও তার অন্তরে দেশপ্রেমের যে আগুন জ্বলছিল, তা তার প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকাশ পেয়েছে। সে নিজের জীবনের সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পের গোপন তথ্য সংগ্রহ করত, তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করত এবং সফল গেরিলা আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করত। দেশের বিপদের দিনে নিজের অস্তিত্ব ভুলে রফিক যেভাবে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য লড়াই করেছে, তা প্রমাণ করে যে প্রকৃত দেশপ্রেম কখনো গোপন থাকে না; তা উপযুক্ত সময়ে বীরত্বপূর্ণ কাজের মধ্য দিয়েই আত্মপ্রকাশ করে।
বদিউজ্জামান মত বদলে নীলগঞ্জে ফিরে গিয়েছিল কারণ নিজের পরিবার ও গ্রামীণ স্বজনদের বিপদের মুখে ফেলে একা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা তার বিবেক ও আত্মসম্মানে চরম আঘাত করেছিল।
শুরুতে বদিউজ্জামান পাকিস্তানি হানাদারদের হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিল। কিন্তু যাওয়ার পথে সে উপলব্ধি করে যে জন্মভূমি ও ভালোবাসার মানুষদের চরম বিপদে একা ফেলে পালিয়ে বেঁচে থাকা চরম কাপুরুষতা। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়ানো ও তাদের সাহস জোগানোই একজন দায়িত্বশীল মানুষের কাজ। এই তীব্র অপরাধবোধ ও স্বজনপ্রেম থেকেই সে মত বদলে আবার নীলগঞ্জে ফিরে এসেছিল।
“মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে কে কী করবে তা আগে থেকে বলা অসম্ভব”— মন্তব্যটি '১৯৭১' উপন্যাসে আজিজ মাস্টার ও জয়নাল মিয়া চরিত্রের সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
আজিজ মাস্টার ছিলেন শান্ত স্বভাবের আদর্শবাদী শিক্ষক। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি অসীম সাহসের পরিচয় দেন এবং হানাদারদের সামনে মাথা নত না করে গৌরবের সাথে মৃত্যুকে বরণ করে নেন।
অন্যদিকে জয়নাল মিয়া আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ হলেও চরম সংকটের মুহূর্তে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং প্রাণ বাঁচাতে আপসের পথ খোঁজার চেষ্টা করে।
মৃত্যুর মতো চরম সংকটই মানুষের চরিত্রের আসল রূপ বের করে আনে। কে ভীরু হবে আর কে বীরের মতো অমর হবে, তা আগে থেকে বিচার করা অসম্ভব— এই দুই চরিত্রের পরিণতিতে তা স্পষ্ট হয়েছে।
রুয়াইল বাজার ছিল স্থানীয় জনপদের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, সামাজিক সম্প্রীতির মিলনমেলা এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এক বাণিজ্যকেন্দ্র বলে স্থানীয় মানুষ এটি নিয়ে গভীর অহংকার করত।
এই বাজারে আশপাশের বহু গ্রামের কৃষক, তাঁতি, জেলে ও ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য বেচাকেনা করতে আসত। সেখানে কেবল বাণিজ্য হতো না, হতো গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখের আলাপ ও ভ্রাতৃত্বের বিনিময়। এলাকার সমৃদ্ধি ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে রুয়াইল বাজার ছিল সবার কাছে এক পরম গৌরবের স্থান।
“নীলগঞ্জ আসলে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি”— উক্তিটি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলায় পাকিস্তানি জান্তার যে নারকীয় তাণ্ডব এবং তার বিপরীতে বাঙালির যে বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, নীলগঞ্জ তারই একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতীকী রূপ।
উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের শান্তি ধ্বংস হওয়া, পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম ক্যাম্প স্থাপন, নিরীহ মানুষ হত্যা, মা-বোনদের লাঞ্ছনা, রাজাকারদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরবর্তীতে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ ও বিজয়— প্রতিটি উপাদান সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ইতিহাসের সাথে হুবহু মিলে যায়। নীলগঞ্জের রক্তক্ষরণ ও প্রতিরোধই একাত্তরের সমগ্র বাংলাদেশ।
উক্তিটির মাধ্যমে চরম বিপদ ও অস্তিত্বের সংকটে মানুষ যখন চারদিক থেকে নিরাশ হয়ে পড়ে, তখন সে সবার আগে নিজের পরিবার, রক্ত ও স্বজাতীয় মানুষের আশ্রয়েই ফিরে যেতে চায়— এই চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক সত্যকে বোঝানো হয়েছে।
'১৯৭১' উপন্যাসে দেখা যায়, যখন পাকিস্তানি হানাদাররা গ্রামে গণহত্যা ও তাণ্ডব শুরু করে, তখন মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজের ভাই, পিতা, সন্তান ও স্বগোত্রের মানুষদের খোঁজ করতে থাকে। জীবনের চরম অনিশ্চয়তায় রক্ত ও ভালোবাসার মানুষের বন্ধনই মানুষের একমাত্র পরম আশ্রয় হয়ে ওঠে।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য ও যথার্থ। সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু কোনো উঁচু তলার রাজনীতি নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম নিপীড়নে নিষ্পেষিত সাধারণ মাটির মানুষের সীমাহীন দুঃখ, ত্যাগ ও জীবনযন্ত্রণা।
উপন্যাসে দেখা যায়, যুদ্ধ কীভাবে কৃষক মীর আলির ঘর ভেঙে দিয়েছে, সাধারণ মা-বোনদের চরম লাঞ্ছিত করেছে, কিশোরদের অকালে সন্তানহারা ও পিতাহারা করেছে এবং গোটা গ্রামকে এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। এই সাধারণ মানুষদের না ছিল উন্নত অস্ত্র, না ছিল কোনো নিরাপদ আশ্রয়; তবুও তারা নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে চরম যন্ত্রণা সহ্য করে দেশের জন্য দাঁড়িয়েছিল। তাদের এই অশ্রুভেজা বাস্তবতাই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।