আলী ইবনে আব্বাস তাঁর পরম উপকারীর প্রাণভিক্ষা চেয়ে খলিফা মামুনের ক্রোধ প্রশমিত করে ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পেরেছিলেন বলে উক্তিটি করেছেন।
খলিফা মামুন দামেস্কের বন্দি ব্যক্তিকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আলী ইবনে আব্বাস খলিফাকে জানান যে, এই ব্যক্তিই একসময় তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন। তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে এই মহানুভব ব্যক্তির প্রাণভিক্ষা চান। খলিফা মামুন এই ত্যাগ ও কৃতজ্ঞতাবোধ দেখে মুগ্ধ হয়ে বন্দিকে মুক্তি দেন। ফলে উপকারীর প্রতিদান দেওয়ার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা পূরণ হওয়ায় আলী আনন্দের সাথে এ কথা বলেন।
উদ্দীপকের মাহমুদ সাহেব নিঃস্বার্থভাবে আহত আবু জাফরকে হাসপাতালে নিয়ে জীবন রক্ষা করে 'প্রত্যুপকার' গল্পের দামেস্কের অজ্ঞাত মহানুভব ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'প্রত্যুপকার' গল্পে দেখা যায়, আলী ইবনে আব্বাস যখন চরম বিপদে পড়ে প্রাণভয়ে পালিয়েছিলেন, তখন দামেস্কের এক অপরিচিত ব্যক্তি কোনো প্রতিদানের আশা না করে তাঁকে নিজের ঘরে সসম্মানে আশ্রয় দিয়ে তাঁর জীবন বাঁচিয়েছিলেন।
উদ্দীপকের মাহমুদ সাহেবও বিশ্বরোডে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা অপরিচিত আবু জাফরকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং জীবন রক্ষা করেন। কোনো স্বার্থ ছাড়া বিপন্ন মানুষকে পরম আশ্রয়ে বাঁচিয়ে তোলার মহানুভবতার দিক থেকে মাহমুদ সাহেব দামেস্কের সেই আশ্রয়দাতারই প্রতিরূপ।
হ্যাঁ, উদ্দীপকের আবু জাফরের কর্মকাণ্ডে 'প্রত্যুপকার' গল্পের মূল মর্মবাণী— অর্থাৎ উপকারের যথাযোগ্য প্রতিদান ও আজীবন কৃতজ্ঞতাবোধের নিখুঁত প্রতিফলন ঘটেছে।
'প্রত্যুপকার' গল্পের মূল শিক্ষা হলো, একজন মহৎ মানুষ কখনো অন্যের উপকারের কথা ভোলে না এবং সুযোগ এলে নিজের সর্বস্ব দিয়েও সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা করে। যেমনটি করেছিলেন আলী ইবনে আব্বাস, যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খলিফার দরবার থেকে আশ্রয়দাতার জীবন রক্ষা করেছিলেন।
উদ্দীপকের আবু জাফরও মাহমুদ সাহেবের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘরে বসে থাকেনি; বরং তাঁর দুর্দিনে আর্থিক সাহায্য নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে এবং তাঁকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। সে অতীতের উপকারের প্রতিদান দিয়ে এক বিরল কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে।
অতএব, নিঃস্বার্থ উপকারের বিপরীতে কৃতজ্ঞতার সাথে পাশে দাঁড়ানোর যে শাশ্বত মানবিক আদর্শ গল্পটিতে রয়েছে, আবু জাফরের কর্মে তারই সার্থক রূপায়ণ ঘটেছে।
স্তবক-১:
"কখনো কখনো কালো আঁধার নেমে আসে জীবন পথে,
তবুও এগিয়ে যেতেই হবে স্বপ্ন বিনির্মাণে।”
স্তবক-২:
"মরুর বুকে ফুটিয়ে দিলে মানবতার ফুল,
ক্ষমার বাণী শুনিয়ে দিলে ভেঙে অন্ধকারের কুল।"
হজরত মুহম্মদ (স.)-এর বাহ্যিক শারীরিক লাবণ্য, অনুপম কান্তি এবং অন্তরের নির্মল আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয় বোঝাতেই উক্তিটি করা হয়েছে।
মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর 'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে মহানবীর দৈহিক ও আত্মিক রূপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তিনি ছিলেন সুশ্রী, সৌম্যদর্শন এবং গম্ভীর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর চোখ ছিল জ্যোতির্ময় এবং মুখের হাসিতে ছিল স্বর্গীয় স্নিগ্ধতা। তাঁর এই অনিন্দ্যসুন্দর মানবিক রূপ যে কাউকেই প্রথম দর্শনে মুগ্ধ ও শ্রদ্ধাবনত করত।
স্তবক-১-এ জীবনের চরম অন্ধকার ও দুর্যোগের মুখেও অটল থেকে স্বপ্ন বিনির্মাণে এগিয়ে যাওয়ার যে প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে, তা 'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে বর্ণিত মহানবীর আজীবন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠার অবিচল সংগ্রামের দিকটিকে প্রতিফলিত করে।
'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে দেখা যায়, আরবের পৌত্তলিক সমাজ মহানবীর ওপর সীমাহীন অত্যাচার, বয়কট ও প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল। তায়িফে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো অন্ধকার বা প্রতিকূলতাই তাঁকে সত্যের পথ ও মানবতার মুক্তির মহান মিশন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
স্তবক-১-এর মূল সুরও হলো জীবনের সকল বাধা-বিপত্তি ও আঁধার পেরিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যা মহানবীর অবিচল ধৈর্য ও সংগ্রামের সাথেই তুলনীয়।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য ও যৌক্তিক। স্তবক-২-এ কেবল মহানবীর ক্ষমাশীলতা ও মানবতার দিকটি প্রকাশ পেলেও 'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে তাঁর চরিত্রের যে সামগ্রিক বহুমাত্রিকতা রয়েছে, তার তুলনায় এটি একটি খণ্ডাংশ মাত্র।
'মানুষ মুহম্মদ (স.)' প্রবন্ধে লেখক কেবল তাঁর ক্ষমা ও দয়ার কথাই বলেননি; বরং তাঁকে এক পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সেখানে রয়েছে তাঁর গৃহকর্মে আত্মনিয়োগকারী সাধারণ জীবন, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিরপেক্ষ সুবিচার, বীর সেনাপতি হিসেবে রণকৌশল, শোকাতুর পিতা হিসেবে মানবিক কান্না এবং অহংকারহীন চরম বিনয়। তিনি নিজেকে কেবল আল্লাহর এক সাধারণ বান্দা ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
স্তবক-২-এ কেবল মরুর বুকে মানবতার ফুল ফোটানো ও ক্ষমার বাণীর কথা বলা হয়েছে, যা তাঁর অনন্ত মানবিক গুণের একটি বিশেষ দিক মাত্র।
সুতরাং, স্তবক-২ মহানবীর ক্ষমার আদর্শকে তুলে ধরলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের সমগ্র ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক বিশালতাকে ধারণ করতে পারেনি; তাই তা প্রবন্ধের খণ্ডাংশ মাত্র।
অর্থ কেবল অন্নবস্ত্রের মতো শারীরিক প্রয়োজন মেটায় কিন্তু আত্মাকে মুক্তি দেয় না বলে অর্থসাধনা কখনোই সামগ্রিক মানবজীবনের মূল সাধনা হতে পারে না।
মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর 'শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব' প্রবন্ধে বলেছেন, জীবসত্তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ কেবল বেঁচে থাকার জন্যই জন্মায়নি। মানুষের আসল পরিচয় তার মানবসত্তা বা মনুষ্যত্বে। সারাক্ষণ কেবল টাকা উপার্জনের চিন্তায় ব্যস্ত থাকলে আত্মিক মুক্তি ও মানবপ্রেমের চেতনা বিনষ্ট হয়। তাই অর্থসাধনা জীবনের পূর্ণাঙ্গ সাধনা নয়।
উদ্দীপকের রিয়াজের নির্লিপ্ত ও দায়িত্বহীন আচরণ 'শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব' প্রবন্ধে বর্ণিত সার্টিফিকেটধারী কিন্তু সহানুভূতিহীন ও মনুষ্যত্ববর্জিত তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের দিকটিকে নির্দেশ করে।
'শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব' প্রবন্ধে বলা হয়েছে, পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করলেই মানুষ শিক্ষিত হয় না। যার অন্তরে মানবতাবোধ ও অপরের ব্যথায় ব্যথিত হওয়ার অনুভূতি জাগ্রত হয়নি, তার শিক্ষা কেবল জীবসত্তার খাঁচাতেই বন্দি থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও রিয়াজ একজন অসুস্থ বৃদ্ধা পড়ে যেতে দেখেও সাহায্য না করে চলে যায়। তার এই স্বার্থপর ও অনুভূতিহীন আচরণ প্রমাণ করে যে তার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকলেও অন্তরে প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধ জন্মায়নি।
উদ্দীপকের নুসরাত শিক্ষার পরম লক্ষ্য— অর্থাৎ 'মনুষ্যত্ব ও সহানুভূতিশীল মানবসত্তা' অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, যা 'শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব' প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য।
প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন, শিক্ষার আসল কাজ হলো মানুষের আত্মাকে জাগ্রত করা এবং তাকে নিঃস্বার্থ মানবসেবা ও মমত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করা। যে শিক্ষা মানুষকে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে শেখায়, তা-ই হলো সার্থক শিক্ষা।
নুসরাত খোদেজা আপাকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে বাসায় পৌঁছে দিয়েছে এবং সহপাঠীদের নিয়ে তাঁর নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছে। সে কোনো প্রতিদানের আশায় নয়, বরং অন্তরের গভীর মানবিক তাগিদ থেকেই এই কাজ করেছে।
নুসরাতের এই পরোপকারী ও সহানুভূতিশীল মানসিকতা প্রমাণ করে যে সে জীবসত্তার স্তর পেরিয়ে মানবসত্তার আলোকোজ্জ্বল জগতে প্রবেশ করেছে। অতএব, সে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করেছে।
(i) "এই অক্ষর
আত্মীয় পর
সকলেরে কাছে টানে,
এই প্রিয় ভাষা
বুকে দেয় আশা,
বিমোহিত করে গানে।"
(ii) "রক্তমাখা ফেব্রুয়ারির সেই কঙ্কাল আজও ফেরে,
রণক্ষেত্রে না-গিয়েও যারা চিরকাল যুদ্ধ করে।
ইতিহাসের গর্ভ থেকে উঠে আসে অমর বাহিনী,
মৃত্যু নেই যার, সে তো বারুদ হয়ে জ্বলে প্রতিদিনই।”
ভাষাশহিদের রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে প্রত্যক্ষদর্শীদের অন্তরে যে চরম স্তব্ধতা, শোক ও আতঙ্কের হিমশীতল অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা বোঝাতেই উক্তিটি করা হয়েছে।
'একুশের গল্প'-এ পাকিস্তানি পুলিশের বুলেটে যখন রাজপথে তাজা তরুণরা লুটিয়ে পড়েছিল, তখন তাঁদের নিথর দেহ দেখে সহযোদ্ধারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। শোকের তীব্রতা ও মর্মান্তিক দৃশ্য মানুষের স্নায়ুকে অসাড় করে দিয়েছিল। রক্তের উত্তাপের বিপরীতে মৃত্যুর শীতল বাস্তবতাকে বুঝতেই শরীর বরফের মতো জমে যাওয়ার রূপকটি ব্যবহৃত হয়েছে।
উদ্দীপক (i)-এ মাতৃভাষার প্রতি পরম ভালোবাসা, সার্বজনীন সম্প্রীতি এবং আত্মিক আকর্ষণের যে রূপ ফুটে উঠেছে, তার সাথে 'একুশের গল্প'-এ বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির গভীর আবেগের দিকটি উপস্থাপিত হয়েছে।
'একুশের গল্প'-এর মূল প্রেরণা ছিল মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা। বাংলা কেবল একটি ভাষা নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও সকল মানুষকে একসূত্রে বাঁধার পরম আত্মীয়।
উদ্দীপক (i)-এও এই অক্ষর ও ভাষার মাধ্যমে আত্মীয়-পর সবাইকে কাছে টানা এবং অন্তরে আশা ও সুর জাগানোর কথা বলা হয়েছে, যা ভাষা আন্দোলনের মূল আবেগের সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ।
হ্যাঁ, উদ্দীপক (ii) 'একুশের গল্প'-এর মূল সুর— অর্থাৎ ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগের অবিনাশী শক্তি ও অমরত্বকে সম্পূর্ণ যথার্থভাবে ধারণ করতে পেরেছে।
'একুশের গল্প'-এ লেখক দেখিয়েছেন যে তপু বা বরকতদের মৃত্যু কেবল একটি শারীরিক মৃত্যু নয়; এটি এক অমর অবিনাশী বারুদ। তাঁদের রক্ত থেকেই পরবর্তীকালে স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁরা মৃত্যুকে জয় করে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন।
উদ্দীপক (ii)-এও বলা হয়েছে যে, রক্তমাখা ফেব্রুয়ারির শহিদরা কখনো মরেন না; তাঁরা ইতিহাসের গর্ভ থেকে উঠে এসে নিত্যনতুন প্রতিবাদের বারুদ হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকেন।
অতএব, ভাষাশহিদদের রক্তের অমরত্ব এবং জাতির মুক্তির চিরন্তন প্রেরণা হিসেবে একুশের অবিনাশী রূপটি উদ্দীপক (ii)-এ সার্থকভাবে প্রতিফলিত হওয়ায় তা গল্পের মূল সুরকেই ধারণ করেছে।
স্তবক (i):
"বাংলার নদী কী শোভাশালিনী
কী মধুর তার কুলকুল ধ্বনি
দু'ধারে তাহার বিটপীর শ্রেণি
হেরিলে জুড়ায় হিয়া।"
স্তবক (ii):
"ওগো আমার জন্মভূমি,
ওগো অপরূপা ফিরে কি আর পাবো তোমায়?
এ বিদেশ, বিভুঁইয়ে তোমারে স্মরি আনমনে
আঁখি মুছি সযতনে তবু আশা পারি না ছাড়িতে,
বেঁধে রেখেছো যে মা, তোমার স্নেহডোরে।
সুদূর ফ্রান্সে বসে বহু দেশের বহু নদ-নদীর জল পান করলেও কোনো নদীর জলই কবির জন্মভূমির কপোতাক্ষ নদের মতো স্নেহ ও তৃপ্তি দিতে পারেনি বলে কবি এ কথা বলেছেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রবাসে নিঃসঙ্গ জীবন কাটানোর সময় শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষের জন্য কাতর হয়ে পড়েছিলেন। বিদেশের নদ-নদী তাঁর দৈহিক তৃষ্ণা হয়তো মিটিয়েছে, কিন্তু তাঁর অন্তরের যে মাতৃস্নেহের তৃষ্ণা, তা কেবল জন্মভূমির কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলধারাই মেটাতে সক্ষম ছিল। এই গভীর নস্টালজিয়া থেকেই কবির এই ব্যাকুল জিজ্ঞাসা।
স্তবক (i)-এ রূপসী বাংলার নদ-নদীর শোভা, মধুর কুলকুল ধ্বনি এবং তীরের সবুজ গাছপালার যে মনোমুগ্ধকর রূপ আঁকা হয়েছে, তার সাথে 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার নদীর প্রাকৃতিক রূপসৌন্দর্য ও কলধ্বনির ভাব সাদৃশ্যপূর্ণ।
'কপোতাক্ষ নদ' কবিতায় কবি কপোতাক্ষের কলকল স্রোতধ্বনি এবং তার মায়াময় রূপকে পরম ভালোবাসায় স্মরণ করেছেন। নদীর সেই মিষ্টি সুর কবির কানে বাঁশির মতো বাজে।
স্তবক (i)-এও বাংলার নদীর দুই ধারের বৃক্ষরাজি এবং তার স্রোতের কলধ্বনিতে হৃদয় জুড়িয়ে যাওয়ার প্রশান্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা কবির জন্মভূমির নদীর রূপমুগ্ধতার ভাবকেই ধারণ করেছে।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য ও যৌক্তিক। স্তবক (ii) কবির প্রবাসজীবনের নস্টালজিয়া ও ফিরে পাওয়ার আকুলতাকে প্রকাশ করলেও 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার মূল শক্তি— সনেটের আঙ্গিক গঠন, সার্বজনীন স্বদেশপ্রেম ও আত্মনিবেদনের পূর্ণাঙ্গ রূপটি এতে নেই।
'কপোতাক্ষ নদ' কবিতায় কেবল ব্যক্তিগত কান্নাকাটি নয়; সেখানে রয়েছে শৈশবের স্মৃতিচারণ, বিদেশের চাকচিক্যের মোহমুক্তি, নদীর সাথে মাতৃস্নেহের তুলনা এবং পরিশেষে স্বদেশের মানুষের কাছে বিনম্র মিনতি— যেন স্বদেশ তাঁকে এক চিরন্তন সন্তান হিসেবে ভালোবেসে স্মরণে রাখে।
স্তবক (ii)-এ কেবল বিদেশের মাটিতে বসে জন্মভূমিকে স্মরণ করে চোখ মোছার একটি সাধারণ আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। এতে সনেটের জটিল অষ্টক-ষটকের দার্শনিক বিন্যাস বা দেশমাতৃকার প্রতি সর্বজনীন দায়বদ্ধতার গভীরতা অনুপস্থিত।
সুতরাং, স্তবক (ii) কবিতার স্মৃতিবেদনাতুর আবেগের একটি ক্ষুদ্র অংশ স্পর্শ করলেও কবিতার সমগ্র ভাব ও নান্দনিক বিশালতাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে পারেনি।
অর্ধপৃথিবীর পরাক্রমশালী খলিফা হওয়া সত্ত্বেও হজরত উমর (রা.) সাধারণ প্রজাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন এবং নিঃস্বের মতো ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন বোঝাতে উক্তিটি করা হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর 'উমর ফারুক' কবিতায় খলিফা উমরের আত্মত্যাগকে চাঁদের সাথে তুলনা করেছেন। চাঁদ যেমন আকাশের উচ্চতায় না থেকে পৃথিবীতে নেমে এসে অন্ধকার দূর করে, তেমনি উমর রাজপ্রাসাদের আভিজাত্য ত্যাগ করে ধূলিমলিন পথে নেমে অনাহারক্লিষ্ট মানুষের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং ভৃত্যের জন্য নিজে উটের রশি টেনেছেন।
উদ্দীপকের এন. ইসলামের দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে জনসেবা করা এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনার মাঝে 'উমর ফারুক' কবিতার খলিফা উমরের প্রজাবাৎসল্য ও সমাজসেবামূলক রূপটি ফুটে উঠেছে।
'উমর ফারুক' কবিতায় দেখা যায়, খলিফা উমর সবসময় সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য ব্যাকুল থাকতেন। তিনি নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে প্রজাদের ঘরে ঘরে যেতেন এবং সবার মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
উদ্দীপকের এন. ইসলামও একজন আদর্শবান নেতা যিনি নিঃস্বার্থভাবে এলাকার মানুষের সেবা করেন এবং সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চান। খলিফা উমরের মানবপ্রেম ও জনকল্যাণমুখী মানসিকতাই তাঁর কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
মন্তব্যটি যথার্থ। উদ্দীপকে কেবল এন. ইসলামের সমাজসেবামূলক কিছু কাজ স্থান পেলেও 'উমর ফারুক' কবিতায় বর্ণিত উমরের অসীম বীরত্ব, কঠোর শাসন, ইসলামি অনুশাসন ও আত্মত্যাগের সামগ্রিক রূপটি উদ্দীপকে প্রকাশ পায়নি।
'উমর ফারুক' কবিতায় হজরত উমরের চরিত্র ছিল একাধারে অটল সুবিচারক, আল্লাহভীরু তপস্বী, রণক্ষেত্রের অপরাজেয় বীর এবং নিজ পুত্রের অপরাধেও আপসহীন এক অনন্য মহামানবের রূপ। তাঁর চরিত্র ছিল এক বিশাল সমুদ্রের মতো।
উদ্দীপকে কেবল একজন ভালো সমাজসেবকের দানশীলতা ও সেবামূলক কাজের ক্ষুদ্র রূপটুকু প্রদর্শিত হয়েছে, যা খলিফা উমরের বহুমুখী ও কালজয়ী নেতৃত্বের তুলনায় নিতান্তই সীমিত।
অতএব, উদ্দীপকটি খলিফা উমরের পরোপকারী চরিত্রের একটি অংশ প্রকাশ করতে পারলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের সমগ্র ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক মহিমাকে ধারণ করতে পারেনি।
মানুষের ব্যক্তিগত মৃত্যু বা অনুপস্থিতির পরেও প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য, পাখির কলকাকলি ও জীবনের শাশ্বত আনন্দ অমলিন থাকবে বোঝাতে উক্তিটি করা হয়েছে।
জীবনানন্দ দাশের 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল সুর হলো প্রকৃতির অবিনশ্বরতা। কবি জানেন তিনি একদিন মারা যাবেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে পল্লীপ্রকৃতির কিছুই থেমে থাকবে না। সন্ধ্যার শান্ত বাতাসে লক্ষ্মীপেঁচা তার প্রিয় সঙ্গীর জন্য পরম মমতায় গান গেয়ে যাবে এবং প্রকৃতির আনন্দধারা চিরকাল বহমান থাকবে।
উদ্দীপকের ধ্বংসপ্রাপ্ত জমিদার বাড়ি এবং তার ইট খসে পড়ার দৃশ্য 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় বর্ণিত মানবসভ্যতা ও বৈষয়িক অহংকারের ক্ষণস্থায়িত্ব ও নশ্বরতাকে ইঙ্গিত করে।
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাচীন এশিরিয়া ও ব্যাবিলনের মতো প্রতাপশালী সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে ধুলোয় মিশে গেছে। মানুষের তৈরি বড় বড় অট্টালিকা ও ক্ষমতা একদিন বিলীন হয়ে যায়।
উদ্দীপকের জমিদার বাড়িটিও একসময় খুব প্রতাপশালী ছিল, কিন্তু আজ তা ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ইট খসে পড়া এক ভগ্নস্তূপ। এটি মানুষের তৈরি পার্থিব কীর্তির ধ্বংসশীলতারই বাস্তব রূপ।
মন্তব্যটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ। শ্রীবাস দত্তের নাতি যেভাবে ধ্বংসের মাঝেও নতুন রাস্তার নির্মাণ এবং বটগাছের চারা গজানোর মাধ্যমে প্রকৃতির অনন্ত সৃষ্টিশীলতাকে উপলব্ধি করেছে, তা-ই মূলত 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল ভাববস্তু।
জীবনানন্দ দাশ কবিতায় দেখিয়েছেন যে, মানুষ চলে যায়, কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। প্রকৃতির নিয়মেই এক রূপের ধ্বংস থেকে আরেক নতুন রূপের জন্ম হয় এবং সৌন্দর্যের সৃষ্টিধারা অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে।
উদ্দীপকের নাতি প্রথমে বিষয়টি না বুঝলেও দাদুর মৃত্যুর পর বুঝতে পারে যে জমিদার বাড়ির ইট খসে গ্রামের নতুন রাস্তা তৈরি হয়েছে এবং প্রাচীন বটগাছের বীজ থেকে নতুন প্রাণের বিকাশ ঘটছে।
এই যে মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের বিপরীতে প্রকৃতির চিরন্তন নবায়ন ও অমরত্বের চেতনা— তা-ই 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল দর্শন। সুতরাং, নাতির এই জাগ্রত বোধই কবিতার ভাববস্তুকে ধারণ করেছে।
উদ্দীপক-(i): মাস তিনেকের খরায় গ্রামের জমি ফেটে খাঁ খাঁ করছিল। কৃষক রমিজ ও তার পরিবার আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করছিল। এক বিকেলে কালো মেঘ জমে ভারী বৃষ্টি নামল। রমিজ তার ছেলেকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বলল, "এই বৃষ্টিই তো আমাদের নতুন জীবনের সূচনা করল।"
উদ্দীপক-(ii): বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনিমিতা বৃষ্টিভেজা সড়কের দিকে তাকিয়ে আছে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির শব্দ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবে- যখন দাদুবাড়ির আঙিনায় মাটির গন্ধমাখা বৃষ্টিতে ভিজে সে কাগজের নৌকা ভাসাত।
বর্ষার ঘন কালো মেঘ চারদিকের আকাশ ও মাঠকে স্নিগ্ধ আঁধারে আবৃত করে দিয়েছে বোঝাতেই চরণাংশটি ব্যবহৃত হয়েছে।
শামসুর রাহমানের 'বৃষ্টি' কবিতায় বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন রূপের চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। আষাঢ়-শ্রাবণে যখন মেঘের দল আকাশ ছেয়ে ফেলে, তখন গ্রীষ্মের প্রখর রোদ মুছে গিয়ে সমগ্র প্রকৃতিতে এক স্নিগ্ধ, শীতল ও মায়াবী অন্ধকারের ছায়া নেমে আসে। প্রকৃতির এই অপরূপ কাজলকালো রূপবৈচিত্র্য প্রকাশ করতেই কবি এ কথা বলেছেন।
উদ্দীপক-(i) খরাক্লিষ্ট রুক্ষ প্রকৃতির শুষ্কতা দূর করে কৃষিজীবী মানুষের জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার ও আশার প্রতীক হিসেবে বৃষ্টির বাস্তব উপযোগিতাকে উপস্থাপন করেছে।
'বৃষ্টি' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কীভাবে তৃষ্ণার্ত প্রকৃতি ও মেঠো পথ বৃষ্টির ধারায় সজীব হয়ে ওঠে। বৃষ্টি এলে চাষির মুখে হাসি ফোটে, ফসলের খেত সতেজ হয় এবং প্রাণহীন প্রকৃতি নতুন রূপ পায়।
উদ্দীপক-(i)-এও তিন মাসের খরার পর ভারী বৃষ্টি নামায় কৃষক রমিজের পরিবার বৃষ্টির পানিতে ভিজে নতুন জীবনের সূচনা দেখার আনন্দ প্রকাশ করেছে, যা কবিতার প্রকৃতি ও মানবজীবনে বৃষ্টির প্রাণসঞ্চারী রূপেরই প্রতিফলন।
মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য ও যথার্থ। 'বৃষ্টি' কবিতাটি কেবল কোনো একটি বিশেষ দিকের বর্ণনা নয়; বরং তা প্রাকৃতিক উপযোগিতা এবং মানবমনের স্মৃতিময় অনুভূতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন, যা উদ্দীপক দুটির সম্মিলিত রূপেই প্রকাশ পায়।
'বৃষ্টি' কবিতার একটি স্তর হলো বাস্তব জগতের স্তর— যেখানে বৃষ্টি মাটি ভেজায়, ফসলে প্রাণ দেয় এবং ধরণীর পিপাসা মেটায় (যা উদ্দীপক-i-এ কৃষক রমিজের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান)। কবিতার আরেকটি স্তর হলো নস্টালজিক ও রোমান্টিক মনের স্তর— যেখানে বৃষ্টি মানুষকে শৈশবের স্মৃতি, মাটির সোঁদা গন্ধ ও আবেগের গভীরে নিয়ে যায় (যা উদ্দীপক-ii-এ অনিমিতার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাগজের নৌকা ভাসানোর স্মৃতিতে প্রকাশিত)।
এই বাস্তব প্রয়োজন এবং মনের কাব্যিক অনুভূতির যৌথ সমন্বয়েই বৃষ্টি কবিতার পূর্ণাঙ্গ রূপটি গড়ে উঠেছে।
অতএব, উদ্দীপক-(i) ও উদ্দীপক-(ii) পৃথক নয়, বরং উভয়ের সম্মিলিত ভাবনাই 'বৃষ্টি' কবিতার সামগ্রিক বার্তা ও মূল সুরকে পরিপূর্ণতা দান করেছে।
উক্তিটি সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন একাত্তরের অবরুদ্ধ ও আতঙ্কগ্রস্ত পরিস্থিতিতে এক অবুঝ কিশোরী কর্তৃক তার দাদার কাছে নিজের মনের গভীর ভয় ও ভীতি প্রকাশের প্রসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করে গানবোট ও কামানের গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে গণহত্যা চালায়, তখন রাতের অন্ধকারে সেই ভয়াবহ শব্দ ও রক্তের গন্ধ সাধারণ শিশু-কিশোরদের মনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। মৃত্যুর এই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরম নির্ভরতার স্থান দাদার হাত আঁকড়ে ধরে বালিকাটি ভয়ার্ত কণ্ঠে মনের অজান্তেই এই আর্তনাদ করেছিল।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের দ্বারা বাঙালি নারীদের ওপর পরিচালিত পাশবিক নির্যাতন ও লাঞ্ছনার এক মর্মান্তিক ও বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।
উপন্যাসে দেখা যায়, পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে ঢুকে বাড়িঘর তল্লাশির নামে নারীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাত। যুবতী ও গৃহবধূদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে আর্মি ক্যাম্পে আটকে রাখা হতো এবং তাঁদের ওপর দিনের পর দিন অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালানো হতো। নারীদের এই লাঞ্ছনা ও কান্না সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অবরুদ্ধ মা-বোনদের আত্মত্যাগের চরম মূল্যকে নির্দেশ করে।
অনুফা হলো সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসের এক প্রতিবাদী, বাস্তববাদী ও সাহসী গ্রামীণ নারী চরিত্র।
অনুফা মীর আলির ওপর বিরক্ত হয়েছিল কারণ পাকিস্তানি হানাদারদের চরম আক্রমণের মুখে যখন দ্রুত আত্মরক্ষা, পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া এবং প্রতিরোধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি ছিল, তখন মীর আলির অতিরিক্ত দ্বিধাগ্রস্ততা, ভীরুতা ও নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা সে মেনে নিতে পারেনি। সংকটকালে এমন অসাড়তা পরিবারের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে বলেই অনুফা ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
“নীলগঞ্জ গ্রামই যেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি”— উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যথার্থ। কারণ ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলাদেশে পাকিস্তানি জান্তার যে ধ্বংসযজ্ঞ এবং তার বিপরীতে আপামর জনতার যে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, নীলগঞ্জ গ্রামে তারই সম্পূর্ণ প্রতিরূপ প্রতিফলিত হয়েছে।
নীলগঞ্জ ছিল একটি সাধারণ শান্ত গ্রাম। কিন্তু ২৫শে মার্চের পর হানাদারদের আগমন, নিরীহ মানুষকে হত্যা, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, রাজাকারদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং তার বিপরীতে যুবকদের মুক্তিবাহিনীতে যোগদান, নারীদের খাদ্য ও তথ্য সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের প্রতিটি ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ইতিহাসকেই মূর্ত করে তুলেছে।
'১৯৭১' উপন্যাসের রফিক চরিত্রটিকে প্রতীকী চরিত্র বলা হয় কারণ সে কেবল একজন ব্যক্তি নয়, বরং সে একাত্তরের সমগ্র বীর বাঙালি তরুণ ও নির্ভীক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অবিচল দেশপ্রেম ও অপরাজেয় শক্তির প্রতীক।
রফিক ব্যক্তিগত জীবনের সুখ ও পরিবারের মায়া ত্যাগ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে রণকৌশল প্রণয়ন করে, শত্রুশিবিরে আঘাত হানে এবং সাধারণ মানুষকে সাহস জোগায়। তার এই তারুণ্যদীপ্ত সাহস ও আত্মোৎসর্গ সমগ্র মুক্তিকামী তরুণ সমাজের প্রতিমূর্তি বলেই তাকে প্রতীকী চরিত্র বলা হয়।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে দেখা যায়, পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম গণহত্যা ও পাশবিকতা যখন অস্তিত্বের চরম সংকটে রূপ নেয়, তখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া বাঙালি জাতি বাঁচার একমাত্র পথ হিসেবে ভয়কে জয় করে সশস্ত্র ও প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।
বাঙালিরা শুরুতে অহিংস ও শান্তিপ্রিয় থাকলেও পাকিস্তানিরা যখন তাদের মাতৃভূমি, সম্মান ও জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস করে দিতে উদ্যত হয়, তখন মানুষ বুঝতে পারে যে ভীরু হয়ে ঘরে বসে থাকলেও মৃত্যু অবধারিত। তাই কাপুরুষের মতো মরার চেয়ে বীরের মতো শত্রুকে খতম করে বেঁচে থাকার প্রত্যয় থেকেই ভয় দূর হয়ে তাদের অন্তরে জন্ম নেয় তীব্র প্রতিরোধ ও অসীম সাহস।
মেজর এজাজ হলো সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসের এক নিষ্ঠুর, দাম্ভিক ও চক্রান্তকারী পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার চরিত্র।
সে নীলগঞ্জ এলাকায় সামরিক অভিযানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। মেজর এজাজ ছিল অত্যন্ত ধূর্ত ও মানবতাহীন। সে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে স্থানীয় রাজাকারদের ব্যবহার করত এবং নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা ও নারীদের ওপর নির্যাতন চালাত। বিচারের নাম করে গ্রামের মানুষকে ফাঁদে ফেলা এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য।
“'১৯৭১' উপন্যাসে যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত একপক্ষীয়”— উক্তিটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আধুনিক ভারী অস্ত্র ও কামান থাকলেও সাধারণ মানুষের নৈতিক মনোবল ও স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষার মুখে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিরা সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।
শুরুতে পাকিস্তানি হানাদাররা অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর একতরফা ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা চালিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সমগ্র বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে, তখন শত্রুপক্ষের অস্ত্র ও পেশাদারিত্ব নৈতিক শক্তির কাছে পরাজিত হতে শুরু করে। হানাদাররা চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনীর ফাঁদে আটকা পড়ে এবং তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। এভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের জয় হয়ে যুদ্ধটি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।