প্রতাপের বিয়ের ঘোষণার কথা শুনে সুভার অবুঝ হৃদয়ে গোপন প্রেমের যে আকুলতা ও হারানোর তীব্র মর্মবেদনা জেগে উঠেছিল, তা প্রকাশ করতেই উক্তিটি করা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভা' গল্পে প্রতাপ ছিল সুভার একমাত্র মানবসঙ্গী যে ছিপ ফেলে মাছ ধরার সময় সুভার পাশে বসে থাকত। সুভা প্রতাপের কোনো উপকার করার জন্য ব্যাকুল থাকত। কিন্তু যখন প্রতাপ অবহেলাভরে বলল, 'কী সু, তোর নাকি বর পাওয়া গেছে, তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস?' তখন সুভার হৃদয় শিকারির তীরে বিদ্ধ হরিণীর মতো ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েছিল।
উদ্দীপকের নিক ভুজিসিক শারীরিক অপূর্ণতাকে জয় করে বিশ্বজয়ী বক্তা হিসেবে নিজের আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছেন, পক্ষান্তরে 'সুভা' গল্পের সুভা সমাজের অবহেলা ও কুসংস্কারে নিজের অস্তিত্বকে পরিবারের বোঝা মনে করে নীরব কান্নায় আত্মবিসর্জন দিয়েছে।
নিক ভুজিসিক চার হাত-পা না থাকা সত্ত্বেও নিজের মানসিক শক্তি ও পরিবারের সহায়তায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে লক্ষাধিক মানুষের অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছেন।
পক্ষান্তরে, সুভা সমাজ ও পরিবারের লোকলজ্জা ও অন্ধ কুসংস্কারের শিকার হয়ে কোনো শিক্ষা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পায়নি; বরং সে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে নীরব ট্র্যাজেডিতে হারিয়ে গেছে। এই ইতিবাচক সংগ্রাম ও অসহায় আত্মসমর্পণের দিক থেকেই উভয়ের মাঝে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যথার্থ। সুভার যদি নিজস্ব আত্মপ্রত্যয় প্রকাশ করার সুযোগ ও আধুনিক শিক্ষা থাকত, তবে সে সমাজের কাছে করুণার পাত্রী না হয়ে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পারত।
'সুভা' গল্পে দেখা যায়, সুভা বোবা হলেও তার ছিল প্রখর অনুভূতিশীল মন, অসাধারণ বুদ্ধি ও প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা। কিন্তু উনিশ শতকের গ্রামীণ অন্ধকার সমাজে মেয়েদের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। ফলে সুভার পিতা-মাতা তাকে একপ্রকার পণ্য বানিয়ে কলকাতায় গোপনে বিয়ে দিয়ে আসেন।
উদ্দীপকের নিক ভুজিসিক দশ বছর বয়সে আত্মহত্যার কথা ভাবলেও পরবর্তীতে আত্মবিশ্বাসের জোরে বিশ্বকে জয় করেছেন। সুভা যদি উপযুক্ত শিক্ষা, পরিবারের সক্রিয় মানসিক সমর্থন এবং প্রতিবাদের স্বাধীনতা পেত, তবে তার জীবন এমন নিঃসঙ্গ অন্ধকারের ট্র্যাজেডিতে রূপ নিত না; সেও সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারত।
"তার পর চেয়ে আসমান পানে বৃদ্ধ কহিল— বাপ ।
শত্রুরে তোর তলোয়ার তলে পেয়েও করিনু মাফ।
এতদিন পরে তোর হত্যার লইলাম প্রতিশোধ,
খুনের নেশায় আর করিব না, আখেরের পথরোধ।”
খলিফার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে যাতে কেউ দেখতে না পায় বা সে পালিয়ে গিয়ে আরও বড় বিপদে না পড়ে, সেজন্য আলী তাকে নিজের ঘরের নির্জন প্রকোষ্ঠে সাবধানে রুদ্ধ করে রেখেছিলেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'प्रत्यুপকার' গল্পে দেখা যায়, খলিফা মামুন দামেস্কের এক বন্দিকে আলীর জিম্মায় রেখে কঠোর নজরদারিতে রাখার আদেশ দিয়েছিলেন। আলী খলিফার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে এবং বন্দির নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সুরক্ষিত কামরায় আটকে রেখেছিলেন।
উদ্দীপকে বৃদ্ধ পিতা কর্তৃক নিজ পুত্রের হত্যাকারীকে হাতের কাছে পেয়েও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টি 'প্রত্যুপকার' গল্পের খলিফা মামুন কর্তৃক চরম শত্রুকে ক্ষমা প্রদর্শন করার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
'প্রত্যুপকার' গল্পে দেখা যায়, দামেস্কের বন্দি ব্যক্তিটি খলিফা মামুনের পরম শত্রু ছিল এবং খলিফা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য অধীর ছিলেন। কিন্তু যখন আলী ইবনে আব্বাসের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে এই ব্যক্তি একসময় আলীর প্রাণ বাঁচিয়েছিল, তখন খলিফা নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত ক্রোধ ও প্রতিশোধস্পৃহা ভুলে বন্দিকে সানন্দে ক্ষমা করে দেন এবং পুরস্কৃত করেন।
উদ্দীপকের বৃদ্ধও প্রতিশোধের নেশা ত্যাগ করে শত্রুকে মাফ করে দিয়ে ক্ষমার সেই মহান আদর্শকেই বাস্তবায়ন করেছেন।
মন্তব্যটির মূল্যায়ন করলে দেখা যায় এটি সম্পূর্ণ যথার্থ। উদ্দীপকে কেবল 'শত্রুকে ক্ষমা প্রদর্শন' করার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু 'প্রত্যুপকার' গল্পের প্রধান ভিত্তি— অর্থাৎ 'উপকারীর ঋণ স্বীকার ও প্রতিদান দেওয়া'র দিকটি উদ্দীপকে অনুপস্থিত।
'প্রত্যুপকার' গল্পের মূল সুর হলো কৃতজ্ঞতাবোধ। আলী ইবনে আব্বাস দামেস্কের অজ্ঞাত ব্যক্তির আশ্রয়ে থেকে প্রাণ রক্ষা পেয়েছিলেন। বহু বছর পর সেই ব্যক্তিকে খলিফার দরবারে বন্দি দেখে আলী নিজের জীবন বাজি রেখে তাঁর ঋণ শোধ করতে এগিয়ে আসেন। এটিই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য।
উদ্দীপকের কবিতাংশে কেবল পুত্রের হত্যাকারীকে ক্ষমা করার একটি আবেগিক দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এতে কোনো পূর্ববর্তী উপকারের ঋণ বা কৃতজ্ঞতার প্রতিদান দেওয়ার কোনো প্রসঙ্গ নেই।
সুতরাং, উদ্দীপকটি গল্পের ক্ষমার বিশেষ একটি অংশকে স্পর্শ করলেও গল্পের মূল ভাববস্তু অর্থাৎ উপকারের প্রত্যুপকার করার সমগ্র চেতনাকে ধারণ করেনি।
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কেবল মুখস্থবিদ্যা ও সনাতন সিলেবাসের গণ্ডিবদ্ধ বিষয়, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত হওয়া হলো স্বাধীন চিত্তে জ্ঞানার্জন ও মনের সার্বিক বিকাশ লাভ করা বোঝাতেই এ কথা বলা হয়েছে।
প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'বই পড়া' প্রবন্ধে বলেছেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল ডিগ্রিধারী তৈরি করে যারা পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে। কিন্তু তাদের চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি বিকশিত হয় না। যে ব্যক্তি নিজে থেকে জ্ঞান অন্বেষণ করে এবং সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে পারে, সে-ই প্রকৃত শিক্ষিত। তাই পাশ করা এবং স্বশিক্ষিত হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বস্তু।
উদ্দীপকে সুজনের এম.এ. পাশের পর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গিয়ে বই পড়ার মাধ্যমে মনের জানালা খুলে যাওয়া এবং লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার মাঝে 'বই পড়া' প্রবন্ধে বর্ণিত স্বশিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন ও লাইব্রেরির গুরুত্বের দিকটি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন, স্কুল-কলেজে জোর করে গিলে খাওয়ানো শিক্ষায় মনের মুক্তি ঘটে না। মানুষ যখন নিজের আনন্দে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ে, তখনই সে প্রকৃত শিক্ষিত হয়।
সুজনও জিপিএ-৫ পেয়ে এম.এ. পাস করার পরও নিজেকে অপূর্ণ ভেবেছিল। কিন্তু লাইব্রেরির বই পড়ে সে বুঝতে পারে স্বশিক্ষিত হওয়াই আসল শিক্ষা। সুজনের এই নবচেতনা প্রবন্ধের মূল ভাববস্তুকেই সমর্থন করে।
মন্তব্যটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ। উদ্দীপকে সুজনের আত্মউপলব্ধি ও দেশের প্রতি অঞ্চলে লাইব্রেরি গড়ে তোলার যে প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে, তা-ই মূলত 'বই পড়া' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর মূল আকাঙ্ক্ষা।
প্রমথ চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, দেশে স্কুল-কলেজের চেয়েও বেশি করে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কারণ লাইব্রেরি হলো এমন এক তীর্থক্ষেত্র যেখানে মানুষ বাধ্য হয়ে নয়, স্বেচ্ছায় নিজের মনের খোরাক সংগ্রহ করতে পারে এবং নিজেকে স্বশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
উদ্দীপকের সুজন ঠিক লেখকের সেই কাঙ্ক্ষিত সত্যটিই জীবনে উপলব্ধি করেছে। সে বুঝতে পেরেছে অন্ধ মুখস্থবিদ্যায় জাতির মুক্তি নেই; মুক্তির একমাত্র পথ হলো অবাধে বই পড়ার সুযোগ তৈরি করা এবং সর্বত্র লাইব্রেরি ছড়িয়ে দেওয়া।
সুজনের এই চিন্তা লেখকের স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দেয়। অতএব, উদ্দীপকে লেখকের আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণ ও সার্থক প্রকাশ ঘটেছে।
সদ্গোপ জাতের মানুষেরা হরিহরকে নিজেদের গ্রামে জমিজমা দিয়ে বসাতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রতিবেশীরা জানলে হিংসা করতে পারে বা বাধা দিতে পারে বলে হরিহর স্ত্রীকে এ কথা গোপনে রাখতে বলেছিল।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পে হরিহর ছিল দরিদ্র ব্রাহ্মণ। দশঘরিয়া গ্রামের সদ্গোপ পরিবারগুলো চেয়েছিল একটি সৎ ব্রাহ্মণ পরিবার তাদের গ্রামে থাকুক। হরিহর এই প্রস্তাবের কথা কাউকে জানাতে বারণ করেছিল কারণ গ্রামীণ সমাজে কারও উন্নতির কথা জানাজানি হলে অন্যান্য প্রভাবশালীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে ক্ষতি করতে পারে।
উদ্দীপকে কৃষক গফুরের চরম দারিদ্র্য, অনাহার এবং শেষ পর্যন্ত ভিটেমাটি ত্যাগ করে দেশান্তরী হওয়ার মাঝে 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের হরিহরের পরিবারের চরম অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটটি ফুটে উঠেছে।
'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পে দেখা যায়, নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে হরিহরের ঘরে চাল-ডালের অভাব ছিল নিত্যদিনের। সে দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিল এবং পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে পৈতৃক ভিটা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল।
উদ্দীপকের গফুরও পেটের দায়ে জমিদারের নির্যাতন ও দারিদ্র্যের শিকার হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে কাজ করতে গেছে। এই গ্রামীণ নিঃস্বতা ও বাস্তুচ্যুতির দিক থেকেই উভয় কাহিনীর মাঝে মিল রয়েছে।
উত্তরের সপক্ষে যুক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য। শরৎচন্দ্রের 'মহেশ' গল্পের গফুরের ট্র্যাজেডি এবং বিভূতিভূষণের 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের মূল সুরের মাঝে বিস্তর মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের মূল শক্তি হলো দারিদ্র্যের মাঝেও ভাইবোন অপু-দুর্গার বাঁধনহারা শৈশব, কাঁচা আম কুড়ানোর অপার আনন্দ ও প্রকৃতির সৌন্দর্য। এখানে জীবন যতই কঠিন হোক, গ্রামীণ প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ এবং অপুর চোখের বিস্ময় গল্পকে এক অনন্য রোমান্টিক ও মানবিক সুর দান করেছে।
পক্ষান্তরে, উদ্দীপকের গফুরের কাহিনীটি চরম সামাজিক অবিচার, জমিদারের শোষণ, ধর্মীয় ভণ্ডামি এবং প্রাণপ্রিয় ষাঁড় মহেশের মৃত্যুর এক নিরেট ও নির্মম বাস্তববাদী ট্র্যাজেডি। এতে শৈশবের কোনো আনন্দ বা প্রকৃতির রোমান্টিক প্রশান্তি নেই; আছে কেবল নিঃস্ব মানুষের বুকফাটা হাহাকার।
অতএব, বাস্তুচ্যুতির কিছুটা মিল থাকলেও শিল্পচেতনা ও মূল সুরের দিক থেকে উভয় কাহিনীর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান।
তীব্র সাইমুম ঝড়ে পার্থিব বহু অট্টালিকা ও সাম্রাজ্য ধসে গেলেও হজরত উমর (রা.)-এর ন্যায়বিচার, সততা ও আত্মত্যাগের অবিচল আদর্শ কোনো শক্তির সামনে নুয়ে পড়েনি বোঝাতে উক্তিটি করা হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর 'উমর ফারুক' কবিতায় খলিফা উমরের চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রশংসা করেছেন। পৃথিবীর কত রাজা-বাদশাহ ঝড়ের তোড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু মরুঝড়ের মাঝেও উমরের ইসলামি সাম্যবাদ ও সুবিচারের সুউচ্চ মিনার চিরকাল উন্নত শিরে দাঁড়িয়ে ছিল।
উদ্দীপকে হজরত উমর ইবনু আব্দুল আজিজের রাজকীয় বিলাসিতা বর্জন, বায়তুল মালের অর্থ নিজের জন্য ব্যয় না করা এবং সাধারণ মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগের মাঝে 'উমর ফারুক' কবিতার খলিফা উমরের কৃচ্ছ্রসাধন ও প্রজাবাৎসল্যের সাদৃশ্য রয়েছে।
'উমর ফারুক' কবিতায় দেখা যায়, খলিফা উমর অর্ধপৃথিবীর শাসক হওয়া সত্ত্বেও নিজের কোনো ব্যক্তিগত ধনসম্পদ জমাননি। তিনি সাধারণ মানুষের চেয়েও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন এবং জনগণের প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখতেন।
উদ্দীপকের পঞ্চম খলিফা উমর ইবনু আব্দুল আজিজও অবিকল সেই মহান নীতি অনুসরণ করে রাজকোষ থেকে নিজের কোনো সুখ গ্রহণ করেননি। সুবিচার ও আত্মত্যাগের এই অনন্য আদর্শের দিক থেকে উভয় ব্যক্তিত্বই একসূত্রে গাঁথা।
যুক্তি অনুযায়ী মন্তব্যটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক ও নীতিগতভাবে সত্য। উদ্দীপকের হজরত উমর ইবনু আব্দুল আজিজ (র.) ও 'উমর ফারুক' কবিতার দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) মূলত একই ইসলামি সুবিচার ও সাম্যের মহান আদর্শের সার্থক ধারক।
ইসলামের ইতিহাসে খলিফা উমর (রা.) ছিলেন ন্যায়বিচার ও প্রজাদরদের শ্রেষ্ঠ প্রতীক। তাঁর প্রবর্তিত সেই শাসনব্যবস্থা পরবর্তীতে উমাইয়া রাজতন্ত্রের ভোগবিলাসে হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু বহু বছর পর খলিফা উমর ইবনু আব্দুল আজিজ ক্ষমতায় এসে রাজপ্রাসাদের সমস্ত বিলাসিতা ছুড়ে ফেলে দিয়ে হুবহু তাঁর মাতামহ উমর ফারুকের নীতি পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি স্বজনপ্রীতি বন্ধ করেন, দুর্নীতির অবসান ঘটান এবং জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেন।
এই কারণে তাঁকেই ইতিহাসে 'উমর সানি' বা 'দ্বিতীয় উমর' বলা হয়। তাঁর প্রতিটি কাজ ছিল উমর ফারুকের আদর্শেরই প্রতিফলন। সুতরাং, তাঁরা উভয়েই একই শাশ্বত আদর্শের ধারক ও বাহক ছিলেন।
একটি পতাকা আনতে
পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়, ব্রহ্মপুত্রে-শীতলক্ষ্যায়-বুড়িগঙ্গায়,
কপোতাক্ষে-কুশিয়ারায়-করতোয়ায়
বয়ে গেল অন্তহীন রক্তের প্রপাত
একটি পতাকা আনতে চর ঈশ্বরদিয়ার কাশবন
শিহরিত হল লাশের উপরে হুমড়ি-খেয়ে-পড়া
শৃগালদলের উন্মত্ত উল্লাসে।
হানাদার বাহিনীর আগুনে বসতবাড়ি ভস্মীভূত হওয়ার পর নিঃস্ব ও দিশেহারা হয়ে মালিকহীন কুকুরটি শূন্য ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে অবিরত আর্তনাদ করেছিল বোঝাতে উক্তিটি করা হয়েছে।
শামসুর রাহমানের 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞের এক করুণ চিত্র আঁকা হয়েছে। তারা শান্ত গ্রাম ও শহর পুড়িয়ে শ্মশান বানিয়ে দিয়েছিল। মানুষের সাথে সাথে অবলা পশুরও সেই মৃত্যুপুরীতে শোক ও আর্তনাদ ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। যুদ্ধের নির্মম ধ্বংসের প্রতীক হিসেবেই কুকুরের আর্তনাদটি এসেছে।
উদ্দীপকে 'শৃগালদলের উন্মত্ত উল্লাসে' বলতে 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী এদেশীয় রাজাকার-আলবদরদের নারকীয় গণহত্যা ও লাশ নিয়ে উল্লাস করার পৈশাচিক বর্বরতাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদাররা সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে তাদের মরদেহ নদী, খাল ও বধ্যভূমিতে ফেলে রাখত। সেখানে হায়েনার মতো পাকিস্তানি নরপশুরা উল্লাস করত এবং শকুনের দল ছিন্নভিন্ন করত। পশুসুলভ এই পাশবিকতা ও রক্তের উৎসবকে রূপক অর্থে শৃগালের উন্মত্ত উল্লাস বলা হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী মন্তব্যটি ইতিহাসের চিরন্তন সত্য। স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়; তা অর্জিত হয়েছে লক্ষ শহিদের বুকের তাজা রক্ত, মা-বোনের আত্মত্যাগ এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে।
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন স্বাধীনতা পেতে বাঙালিকে কী বিপুল মূল্য দিতে হয়েছে— সাকিনা বিবির কপাল ভেঙেছে, হরিদাসীর সিঁদুর মুছে গেছে, অবুঝ শিশু পিতা-মাতার লাশের ওপর কেঁদেছে এবং ছাত্রাবাস-বস্তি পুড়ে ছাই হয়েছে। তবুও বাঙালি পিছু হটেনি; অস্ত্র হাতে লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে।
উদ্দীপকেও রক্তে নদীগুলো লাল হওয়া এবং হাজার লাশের ওপর দিয়ে রক্তিম সূর্য ও লাল-সবুজের পতাকা অর্জনের সেই মহাকাব্যিক সত্য তুলে ধরা হয়েছে।
অতএব, এই অসীম রক্তদান ও শহিদদের আত্মাহুতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে— যা কবিতা ও উদ্দীপকে সমভাবে প্রতিষ্ঠিত।
উদ্দীপক-১:
সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা পলায়ন-
ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন।
উদ্দীপক-২:
কোন্ দেশেতে তরুলতা-
সকল দেশের চাইতে শ্যামল?
কোন্ দেশেতে চলতে গেলেই
দ'ল্তে হয় রে দূর্বা কোমল?
সুদূর ফ্রান্সে বসে নিঃসঙ্গ কবি জন্মভূমির কপোতাক্ষ নদের কাল্পনিক স্রোতধ্বনি শুনে নিজের ব্যাকুল মনকে সান্ত্বনা দেন বলে একে ভ্রান্তির ছলে কান জুড়ানো বলেছেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রবাসে তীব্র মাতৃভূমিবিরহে কাতর ছিলেন। বাস্তবে কাছে না পেলেও তিনি কল্পনায় প্রতিনিয়ত কপোতাক্ষ নদের স্রোতধ্বনি শুনতে পেতেন। কবি জানেন এটি তাঁর মনের একটি মায়াবী কল্পনা বা ভ্রম, তবুও সেই পরম স্মৃতির মায়াজালে আবদ্ধ থেকেই তিনি প্রবাসজীবনের তীব্র হাহাকার দূর করে হৃদয়কে শান্ত রাখতেন।
উদ্দীপক-১-এ জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে আম কুড়ানো, সুমধুর স্তব্ধ দুপুর ও শৈশবের সেই হারানো দিন ফিরে পাওয়ার আকুল স্মৃতিকাতরতার সাথে 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার কবির শৈশবস্মৃতির গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
'কপোতাক্ষ নদ' সনেটে কবি সাগরদাঁড়ির কপোতাক্ষের তীরে কাটানো তাঁর শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোকে পরম মমতায় স্মরণ করেছেন। সুদূর প্রবাসে বসে তিনি শৈশবের সেই শান্ত পরিবেশকে ফিরে পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে ওঠেন।
উদ্দীপক-১-এ রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত চরণেও বাল্যকালের পাঠশালা ও আম কুড়ানোর সোনালী দিনগুলো ফিরে পাওয়ার যে আকুতি প্রকাশ পেয়েছে, তা কবির স্মৃতিকাতর অনুভূতির সাথেই সরাসরি মিলে যায়।
না, উদ্দীপক-২ 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার মূল চেতনাকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারেনি; এটি কেবল প্রকৃতির সাধারণ শ্যামল সৌন্দর্যের একটি প্রশ্ন রেখে গেছে মাত্র।
'কপোতাক্ষ নদ' সনেটের মূল চেতনা নিছক প্রাকৃতিক শ্যামলতার বর্ণনা নয়; এর মূল সুর হলো এক মহিমান্বিত, স্মৃতিবিধুর ও অনুতপ্ত স্বদেশপ্রেম। কবি প্রবাসের চাকচিক্য ছেড়ে উপলব্ধি করেছেন যে কপোতাক্ষের জল তাঁর মায়ের দুধের সমান। তিনি দূর পরবাস থেকে স্বদেশের মানুষের কাছে মিনতি জানিয়েছেন যেন তারা কবিকে স্বদেশের এক স্নেহময় সন্তান হিসেবে স্মরণে রাখে।
উদ্দীপক-২-এ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'ধনধান্য পুষ্পভরা' গানের চরণে কেবল বাংলার তরুলতার শ্যামল রূপের স্তুতি করা হয়েছে। এতে সনেটের সেই তীব্র নস্টালজিয়া, আত্মনিবেদন ও প্রবাসজীবনের বেদনা অনুপস্থিত।
সুতরাং, উদ্দীপক-২ কবিতার শ্যামল প্রকৃতির একটি চিত্র নির্দেশ করলেও 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার আত্মিক স্বদেশপ্রেম ও গভীর দার্শনিক চেতনাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
সমাজে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবানরা কীভাবে সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে এবং বিচারব্যবস্থাকে নিজেদের সুবিধার্থে প্রহসনে রূপান্তর করে, তার প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও বিদ্রূপ প্রকাশ করতেই এ কথা বলা হয়েছে।
সুফিয়া কামালের 'বোশেখ' কবিতায় কবি সমাজে বিদ্যমান কপটতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মুখে মুখে সুবিচারের বহু গল্প শোনানো হলেও বাস্তবে দরিদ্ররাই সর্বদা বঞ্চিত ও নির্যাতিত হয়। ক্ষমতার এই ভণ্ডামিকে নির্দেশ করতেই কবি এই আক্ষেপ করেছেন।
উদ্দীপকে ইউনিয়ন পরিষদের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের দ্বারা দরিদ্র শামসেরের চাল চুরি করা, প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর ও কার্ড বাতিল করার ঘটনাটি 'বোশেখ' কবিতায় বর্ণিত সমাজের নিষ্ঠুর দুর্নীতি ও শোষক শ্রেণির অবিচারের দিকটি তুলে ধরে।
'বোশেখ' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজের সুবিধাবাদী ও ক্ষমতাবানরা নিরীহ ও দুর্বল মানুষের গ্রাস কেড়ে নেয় এবং তাদের ওপর অত্যাচার চালায়। কবি বৈশাখকে সেই সমস্ত শোষক ও দুর্বৃত্তের অহংকার চূর্ণ করার জন্য আহবান জানিয়েছেন।
উদ্দীপকের কর্মচারীদের অমানবিক আচরণ কবিতায় বর্ণিত সেই সামাজিক অন্যায়েরই হুবহু প্রতিফলন।
মন্তব্যটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ। উদ্দীপকে কেবল একটি ত্রাণ দুর্নীতির ঘটনা ও সমাজসেবীর সাহায্য প্রদর্শিত হয়েছে, যা 'বোশেখ' কবিতার সামগ্রিক বিপ্লবী ও দার্শনিক ভাববস্তুর তুলনায় নিতান্তই ক্ষুদ্র এক রূপ।
সুফিয়া কামালের 'বোশেখ' কবিতাটি প্রকৃতির কালবৈশাখি ঝড়কে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে অন্যায় ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক মহাজাগরণের ডাক দিয়েছে। কবিতায় বৈশাখী ঝড়কে কল্পনা করা হয়েছে এক রুদ্র সংহারক শক্তিরূপে— যা সমাজের সমস্ত পাপ, শোষণ ও অসাম্যকে সমূলে ধ্বংস করে নতুন সত্য ও ন্যায়ের পৃথিবী গড়ে তুলবে।
উদ্দীপকে কেবল একজন ব্যক্তির দানশীলতা ও স্থানীয় দুর্নীতির ক্ষুদ্র চিত্র এসেছে। এতে কোনো বৈশাখী ঝড়ের রুদ্র রূপ, সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী আকুলতা কিংবা সার্বজনীন ন্যায়ের আহ্বান নেই।
সুতরাং, উদ্দীপকটি একটি বিচ্ছিন্ন অবিচারের চিত্র তুলে ধরলেও 'বোশেখ' কবিতার সামগ্রিক কালজয়ী ও বিপ্লবী চেতনাকে ধারণ করতে পারেনি।
“দাদা, বড়ো ভয় লাগে!”— উক্তিটি সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন একাত্তরের অবরুদ্ধ ও বিভীষিকাময় মুহূর্তে এক অবুঝ কিশোরী কর্তৃক তার পরম নির্ভরতার আশ্রয় দাদার কাছে মনের গভীর আতঙ্কের প্রকাশ হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে।
পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী যখন রাতের অন্ধকারে নীলগঞ্জ গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে হত্যা করতে থাকে, তখন সেই কামানের গর্জন ও রক্তের গন্ধ সাধারণ শিশুদের মনে চরম ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছোট্ট মেয়েটি পরম ভরসাস্থল দাদার হাত শক্ত করে ধরে এই করুণ আর্তনাদ করেছিল। এটি কেবল একটি শিশুর ভয় নয়, সমগ্র অবরুদ্ধ বাংলাদেশের বিপন্ন অস্তিত্বের হাহাকার।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের দ্বারা বাঙালি নারীদের ওপর পরিচালিত পাশবিক নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও অমানবিক নিপীড়নের এক চরম মর্মান্তিক ও বাস্তব দলিল ফুটে উঠেছে।
উপন্যাসে দেখা যায়, পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে ঢুকে বাড়িঘর তল্লাশির নামে যুবতী ও গৃহবধূদের ওপর বর্বরোচিত শারীরিক নির্যাতন চালাত। বহু নারীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে আর্মি ক্যাম্পে আটকে রাখা হতো এবং দিনের পর দিন তাঁদের আত্মমর্যাদা ও সম্ভ্রম হরণ করা হতো। মা-বোনদের এই অশ্রুভেজা চরম আত্মত্যাগ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় ও রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি।
উক্তিটি সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের এক অভিজ্ঞ ও বাস্তববাদী গ্রামবাসী কর্তৃক পাকিস্তানি হানাদারদের সামরিক বর্বরতা ও হিংস্রতা সম্পর্কে অন্য গ্রামবাসীদের সতর্ক করার প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন গ্রামে প্রবেশ করছিল, তখন কিছু মানুষ ভেবেছিল হয়তো তারা স্বাভাবিক জিজ্ঞাসাবাদ করবে। কিন্তু যারা একাত্তরের নির্মমতা জানত, তারা সতর্ক করে দেয় যে পাকিস্তানি মিলিটারি কোনো সমঝোতা বোঝে না; তারা আসার সাথে সাথেই নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রক্তবন্যা বইয়ে দেয়। হানাদারদের নির্মম চরিত্রের ভয়ংকর রূপ প্রকাশ করতেই এ কথা বলা হয়েছিল।
“অপমানের চেয়ে মানুষ মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে”— আজিজ মাস্টারের চরিত্রের আলোকে বাক্যটির ঐতিহাসিক ও নৈতিক সত্যতা পুরোপুরি প্রমাণিত।
আজিজ মাস্টার ছিলেন গ্রামের এক আদর্শবান ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক। পাকিস্তানি দখলদার মেজর তাঁকে নিজের জীবনের বিনিময়ে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তথ্য দিতে এবং ক্ষমা চাইতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু আজিজ মাস্টার জানতেন মাথা নত করে বেঁচে থাকার অর্থ হলো আজীবন অপমানের দাসত্ব। তাই তিনি কোনো কাপুরুষোচিত সমঝোতা না করে আত্মমর্যাদাকে সমুন্নত রেখে হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নেন। তাঁর আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে দেশপ্রেমিকের কাছে আত্মসম্মানের মূল্য জীবনের চেয়ে অনেক বড়।
উক্তিটি সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে পাকিস্তানি সামরিক অফিসার মেজর এজাজের অমানবিক, নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক আচরণ দেখে চরম ঘৃণা ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে এক সচেতন বাঙালি চরিত্র কর্তৃক মেজরের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল।
মেজর এজাজ যখন কোনো কারণ ছাড়াই সাধারণ নিরীহ মানুষকে পশুর মতো হত্যা করছিল এবং নারীদের ওপর পাশবিক উল্লাস চালাচ্ছিল, তখন তার মধ্যে ন্যূনতম কোনো মানবতাবোধ দেখা যায়নি। তার হিংস্রতা ও পশুর চেয়েও অধম আচরণ প্রত্যক্ষ করে তীব্র ধিক্কার জানিয়ে এ প্রশ্ন করা হয়েছিল যে সে মানুষ নাকি কোনো সাক্ষাৎ রক্তপিপাসু দানব।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে রফিক ও মেজর এজাজের মধ্যকার টানাপোড়েন ছিল মূলত শোষিত বাঙালির স্বাধীনতার চেতনা বনাম পাকিস্তানি হানাদারদের ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক সংঘাত।
মেজর এজাজ চেয়েছিল রফিককে ব্যবহার করে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করতে। কিন্তু রফিক ছিলেন দেশপ্রেমে নিবেদিত এক অসম সাহসী মুক্তিসেনা। তিনি মেজরের ধূর্ত চক্রান্তের বিপরীতে নিজের সামরিক বুদ্ধি দিয়ে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং হানাদার ক্যাম্প ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন। এই দুই বিপরীতমুখী আদর্শের সংঘাতই উপন্যাসের গতিপথকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।
মেজর এজাজ আজিজ মাস্টারকে প্রথম দিকে বিশেষ খাতির করার মূল কারণ ছিল মাস্টারকে হাত করে গ্রামের মানুষকে বশ করা, মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন তথ্য বের করা এবং নিজের বর্বরতার পক্ষে একটি বৌদ্ধিক ও সামাজিক বৈধতা তৈরি করা।
আজিজ মাস্টার ছিলেন এলাকার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব যাঁর কথা পুরো গ্রাম শুনত। মেজর এজাজ ভেবেছিল মাস্টারকে লোভ বা ভয়ের ফাঁদে ফেলতে পারলে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার এক অত্যন্ত ধূর্ত ও মনস্তাত্ত্বিক অপকৌশল।
“'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ আসলে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি”— উক্তিটি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলার প্রতিটি জনপদে যে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ এবং তার বিপরীতে সাধারণ মানুষের যে বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, নীলগঞ্জ তারই এক পূর্ণাঙ্গ প্রতীক।
নীলগঞ্জ ছিল নদী-মাতৃক বাংলার এক শান্ত গ্রাম। কিন্তু ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, সাধারণ মানুষকে হত্যা, মা-বোনদের লাঞ্ছনা, রাজাকারদের চক্রান্ত এবং পরবর্তীতে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ— প্রতিটি ঘটনাই একাত্তরের সমগ্র বাংলাদেশের রক্তক্ষরণ ও বিজয়ের বাস্তব ইতিহাসের সাথে একাকার হয়ে গেছে।