মায়ের তীব্র ঘৃণা, অবহেলা ও 'গর্ভের কলঙ্ক' ভাবার নিষ্ঠুর আচরণে ব্যথিত হয়ে সুভা নিরুপায় চিত্তে অন্তরের নীরব হাহাকার প্রকাশ করতেই এ কথা ভেবেছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভা' গল্পে সুভার মা বোবা মেয়েকে নিজের গর্ভের লজ্জা ও ত্রুটি মনে করতেন। মা সাধারণ মেয়েদের মতো সুভাকে ভালোবাসতেন না, বরং সর্বদাই তাকে একধরনের বিরক্তিকর বোঝা হিসেবে দেখতেন। সুভা তো নিজে চেয়ে বোবা হয়ে জন্মায়নি; তাই মায়ের এই হৃদয়হীন আচরণের মুখে সুভার অবুঝ মন অভিমানে ঈশ্বরের কাছে এই নীরব প্রশ্নটি রেখেছিল।
উদ্দীপকের মাতা প্রতিবন্ধী সন্তানকে অপার স্নেহে আগলে রেখে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, পক্ষান্তরে 'সুভা' গল্পের মাতা বাক্প্রতিবন্ধী সুভাকে গর্ভের কলঙ্ক মনে করে সর্বদা অবহেলা ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করেছেন।
উদ্দীপকের মা শারীরিক প্রতিবন্ধী গানিমকে গর্ভপাত না করিয়ে জন্ম দেন এবং ঘোষণা করেন যে তিনিই হবেন সন্তানের পা। তাঁর এই অকৃত্রিম আত্মত্যাগ সন্তানকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অন্যদিকে, সুভার মা বোবা কন্যাকে সমাজের বোঝা মনে করে নিজের অন্তরের ক্ষোভের শিকার বানাতেন। মাতৃত্বের এই একনিষ্ঠ মমত্ববোধ ও নিষ্ঠুর উপেক্ষার দিক থেকেই উদ্দীপকের মাতার সাথে সুভার মায়ের চরম বিপরীতমুখী চরিত্রগত পার্থক্য বিদ্যমান।
যুক্তি অনুযায়ী মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ। উদ্দীপকের মতো প্রতিটি পরিবার যদি প্রতিবন্ধী সন্তানকে সমাজের বোঝা না ভেবে ভালোবাসা, আস্থা ও যথাযথ সুযোগ দিয়ে গড়ে তুলত, তবে সুভার মতো মেয়েদের জীবন এমন মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে পর্যবসিত হতো না— এটিই 'সুভা' গল্পের মূল মানবিক বার্তা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'সুভা' গল্পে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি অনুভূতিশীল ও নিষ্পাপ বাক্প্রতিবন্ধী কিশোরী সমাজের কুসংস্কার ও পরিবারের অবহেলায় তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে গেছে। সুভাকে গোপনে কলকাতার পাত্রের কাছে ঠকিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
উদ্দীপকে গানিমের পিতা-মাতা প্রতিকূলতাকে জয় করে সন্তানকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে এসেছেন। প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি এমন দায়িত্বশীল ও মমতাময়ী আচরণই গল্পকারের কাঙ্ক্ষিত সমাজচেতনা।
সুতরাং, প্রতিবন্ধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার যে আহ্বান গল্পে সুপ্ত রয়েছে, উদ্দীপকের চেতনা তারই এক সফল ও বাস্তব রূপায়ণ।
উদ্দীপক-১:
"সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে
কঠোর কাজে স্বল্প আয়ে
ফিরে যাই ছোট্ট ঘরে সন্ধ্যা যখন নামে
দুপুর বেলা হয়নি খাওয়া
স্বল্প আয়ের ভয়ে।"
উদ্দীপক-২:
"কখনো বা পুকুর পাড়ে
লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া
মাঝে মধ্যে মায়ের বকা
সেই সব দিন ছিল মোড়া।"
দশঘরিয়া গ্রামে যাওয়ার লাভজনক ও গোপন প্রস্তাবের কথা সর্বজয়া যেন অন্যদের কাছে গল্প করে ফাঁস না করে দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক করতেই হরিহর এ কথা বলেছিল।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পে হরিহর ছিল দরিদ্র ব্রাহ্মণ। দশঘরিয়া গ্রামের সদ্গোপ পরিবারগুলো চেয়েছিল একটি সৎ ব্রাহ্মণ পরিবার তাদের গ্রামে থাকুক। হরিহর এই প্রস্তাবের কথা কাউকে জানাতে বারণ করেছিল কারণ গ্রামীণ সমাজে কারও উন্নতির কথা জানাজানি হলে অন্যান্য প্রভাবশালীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে বাধা দিতে পারে।
উদ্দীপক-১ সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পরও স্বল্প আয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটানোর যে করুণ চিত্র তুলে ধরেছে, তা 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের হরিহরের পরিবারের নিত্যদিনের চরম অর্থনৈতিক দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনকে নির্দেশ করে।
'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পে দেখা যায়, হরিহর সামান্য আয়ের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু ঘরে চাল-ডালের টানাপোড়েন সবসময় লেগে থাকে। সর্বজয়া কোনোমতে সন্তানদের আধপেটা খাইয়ে দিন গুজরান করে।
উদ্দীপক-১-এও স্বল্প আয়ের ভয়ে দুপুরবেলা না খেয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনির যে নির্মম বাস্তব রূপ আঁকা হয়েছে, তা নিশ্চিন্দিপুরের হরিহরের পরিবারের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যথার্থ। দারিদ্র্যের ছায়া থাকলেও 'আম আঁটির ভেঁপু' গল্পের মূল প্রাণভোমরা হলো উদ্দীপক-২-এ বর্ণিত গ্রামবাংলার প্রকৃতির কোলে অপু-দুর্গার বাঁধনহারা শৈশব ও পুকুরপাড়ে দস্যিপনার আনন্দ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের মূল মহত্ত্ব হলো চরম অভাবের মধ্যেও শৈশবের নিষ্পাপ আনন্দকে অক্ষুণ্ন রাখা। দুর্গার বনের ভেতর ছুটে চলা, কাঁচা আম কুড়ানো, জারুল তলায় বসে খেলা করা এবং মায়ের বকা খেয়েও মুখে হাসি থাকার যে চিরন্তন গ্রামীণ শৈশব গল্পে রূপায়িত হয়েছে, তা অনুপম।
উদ্দীপক-২-এ পুকুরপাড়ে লাফঝাঁপ ও মায়ের বকা খাওয়ার স্মৃতি দিয়ে অবিকল সেই চিরায়ত মধুর শৈশবকেই তুলে ধরা হয়েছে।
অভাব-অনটনের চেয়েও প্রকৃতির কোলে ভাইবোনের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আনন্দময় শৈশবই গল্পের মূল ভাববস্তু হিসেবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। সুতরাং, মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য।
নিমগাছের সবুজ পাতায় ভরা ডালে থোকা থোকা সাদা ফুলের স্নিগ্ধ রূপ ও রূপসী লাবণ্যকে নীল আকাশে ভেসে থাকা নক্ষত্রপুঞ্জের রূপকের সাথে তুলনা করে বোঝানো হয়েছে।
বনফুলের 'নিমগাছ' গল্পে লেখক নিমের ফুলের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। সবুজ পাতার সমুদ্রের মাঝে ছোট ছোট শুভ্র নিমফুলগুলো এমনভাবে ফুটে থাকত যেন অনন্ত নীল আকাশ থেকে একঝাঁক উজ্জ্বল তারা সবুজ সাগরে নেমে এসেছে। এই অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক শোভা প্রকাশ করতেই উপমাটি ব্যবহৃত হয়েছে।
উদ্দীপকের নিয়তি দেবী ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের সবার সেবা করে নিজে চরম অবহেলার শিকার হওয়ার মাঝে 'নিমগাছ' গল্পের গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মীবউয়ের নিঃস্বার্থ সেবা ও অবমূল্যায়নের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
'নিমগাছ' গল্পে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে মধ্যবিত্ত পরিবারের লক্ষ্মীবউটি দিনরাত পরিবারের সবার রান্না, সেবা ও পরিচর্যা করে যায়, অথচ তার সুখ-দুঃখ বা ক্লান্তির খবর কেউ রাখে না।
উদ্দীপকের নিয়তি দেবীও শ্বশুর-শাশুড়ি ও সন্তানদের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে নিজে হাঁপিয়ে উঠেছেন, কিন্তু তাঁর প্রতি কারও কোনো সহানুভূতি নেই। নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও পরিবারের চরম অবমূল্যায়নের দিক থেকে উভয় চরিত্রই এক ও অভিন্ন।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী মন্তব্যটি মানবসমাজ ও মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন ট্র্যাজিক বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। শত অবহেলা ও যন্ত্রণার মাঝেও সংসারের মায়ার গভীর বন্ধন ছিন্ন করে কেউ কোথাও চলে যেতে পারে না।
'নিমগাছ' গল্পের শেষ চরণে লেখক দেখিয়েছেন যে, নিমগাছটির মুগ্ধ কবির সাথে চলে যেতে ইচ্ছে হলেও মাটির গভীরের শিকড়ের জন্য সে যেতে পারে না। ঠিক তেমনি সংসারের লক্ষ্মীবউটিও লাঞ্ছনা-বঞ্চনা সত্ত্বেও পরিবার ও সন্তানের মায়াজালে এমনভাবে বন্দি থাকে যে সংসার ত্যাগ করার কথা ভাবতে পারে না।
উদ্দীপকের নিয়তি দেবীও একটানা খাটুনিতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসার মায়ার বাঁধনে বন্দি হয়ে নীরবে সব সহ্য করে যাচ্ছেন।
মায়ার এই অদৃশ্য শৃঙ্খল মানুষকে শত কষ্টের মাঝেও পরিবারে বেঁধে রাখে। সুতরাং, উদ্দীপক ও 'নিমগাছ' গল্পে এই জীবনসত্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আবদুর রহমানের পরিবেশন করা দানবীয় পরিমাণ খাবারের পাহাড় দেখে লেখক এতটাই হতভম্ব ও ভীত হয়ে পড়েছিলেন যে কোনো কথা বলার শক্তি হারিয়ে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন বোঝাতে এ কথা বলেছেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর 'প্রবাস বন্ধু' রচনায় দেখা যায়, আবদুর রহমান প্রথম দিনেই এক বিশাল ভেড়ার আস্ত রান, কোফতা, পোলাও ও মুরগির এক মহাযজ্ঞ লেখকের টেবিলে সাজিয়ে দেয়। একজন মানুষের পক্ষে এই পর্বতসম খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব দেখে লেখক চরম বিস্ময়ে ও আতঙ্কে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন।
উদ্দীপকের রাসেল মৃধার মতো সুঠাম ও বলিষ্ঠ শারীরিক গঠন, কঠোর পরিশ্রমে ক্লান্তিহীন স্বভাব এবং পরোপকারী মানসিকতার সাথে 'প্রবাস বন্ধু' রচনার বিশালদেহী আফগান ভৃত্য আবদুর রহমানের চরিত্রের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।
'প্রবাস বন্ধু' রচনায় আবদুর রহমান ছিল পর্বতসম দেহের অধিকারী, অফুরন্ত শক্তির আধার এবং যেকোনো ভারী কাজ অনায়াসে করতে সক্ষম এক যুবক। তার স্বাস্থ্য ও সেবা ছিল অনন্য।
উদ্দীপকের রাসেল মৃধাও বিদেশের মাটিতে মুটের ভারী কাজ অনায়াসে করে নিজের শারীরিক শক্তি ও কঠোর শ্রমের পরিচয় দিয়েছে। শারীরিক সামর্থ্য ও পরিশ্রমী স্বভাবের দিক থেকেই উভয় চরিত্র সরাসরি সাদৃশ্যপূর্ণ।
মন্তব্যটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ। উদ্দীপকের রাসেল মৃধার উপকূলে সমুদ্রের সাথে লড়াই করার স্মৃতি এবং আবদুর রহমানের পানশিরের বরফ ও প্রকৃতির প্রশংসা মূলত ফেলে আসা জন্মভূমির প্রতি গভীর নস্টালজিয়া ও তীব্র দেশপ্রেমের একই চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনায় আবদুর রহমান কাবুলে কাজ করলেও তার প্রাণ পড়ে থাকত পানশিরের উপত্যকায়। পানশিরের বরফ, নদী ও বাতাসের কথা বলতে গিয়ে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত। তার এই অতিকথন আসলে জন্মভূমির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসারই প্রকাশ।
উদ্দীপকের রাসেল মৃধাও বিদেশে প্রচুর অর্থ ও প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও উপকূলের উত্তাল ঢেউ, নৌকা ও ঝড়-তুফানের সংগ্রামী দিনগুলোকে পরম ভালোবাসায় স্মরণ করেছে। বিদেশের বিলাসের চেয়েও নিজের দেশের প্রতিকূল মাটিই তার কাছে পরম আপন।
উভয়ের স্মৃতিচারণেই জন্মভূমির মাটির সাথে আত্মার নাড়ির বন্ধন উন্মোচিত হয়েছে। সুতরাং, তারা উভয়েই অভিন্ন দেশপ্রেম ও শিকড়ের চেতনার ধারক।
সন্তানের চরম অসুস্থতার ঘোর অন্ধকার দূর হয়ে আল্লাহর দরবারে পিতা বাবরের আত্মোৎসর্গের প্রার্থনার ফলে হুমায়ুনের সুস্থতা ও নবজীবনের উজ্জ্বল আশার সূচনা বোঝাতেই উক্তিটি করা হয়েছে।
গোলাম মোস্তফার 'জীবন বিনিময়' কবিতায় দেখা যায়, হুমায়ুন যখন মৃত্যুর মুখে, তখন বাবর নিজের জীবনের বিনিময়ে পুত্রের প্রাণভিক্ষা চান। এই আত্মদানের ফলে রোগের প্রকোপ কমতে থাকে এবং হুমায়ুনের দেহে জীবনের আলো ফিরে আসে। মৃত্যুর অন্ধকার কেটে গিয়ে আশার প্রভাত দেখা দেওয়াকেই কবি ঊষার পূর্বাভাস বলেছেন।
উদ্দীপকের আসমানীর দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া, বিছানায় মৃত্যুর সাথে লড়াই করা এবং চিকিৎসকদের অপারগতার দৃশ্য 'জীবন বিনিময়' কবিতার রোগশয্যায় শায়িত মুমূর্ষু শাহজাদা হুমায়ুনের ভাগ্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
'জীবন বিনিময়' কবিতায় সুঠাম তরতাজা হুমায়ুন হঠাৎ কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে এবং রাজবৈদ্যরা তাঁর জীবনের আশা ছেড়ে দেন।
উদ্দীপকের আসমানীও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এক অসহায় তরুণ জীবনের আকস্মিক রোগাক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার দিক থেকে আসমানী হুমায়ুনের অবস্থারই প্রতিরূপ।
হ্যাঁ, উদ্দীপকের আসমানীর মা 'জীবন বিনিময়' কবিতার পিতা বাদশা বাবরের এক সার্থক ও যথার্থ প্রতিনিধি; কারণ তিনি সন্তানের জীবন রক্ষার্থে নিজের শরীরের লিভার দান করে বাৎসল্যের এক অনন্য পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন।
'জীবন বিনিময়' কবিতায় সম্রাট বাবর নিজের আরাম-আয়েশ ও জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করে পুত্রের রোগশয্যা প্রদক্ষিণ করে আল্লাহর কাছে নিজের প্রাণের বিনিময়ে পুত্রের জীবন চেয়েছিলেন এবং নিজের জীবন দিয়ে পুত্রকে নবজীবন দান করেছিলেন।
উদ্দীপকের আসমানীর মা-ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোয় নিজের শরীরের অমূল্য অঙ্গ (লিভার) দান করে মৃত্যুমুখী কন্যাকে বাঁচিয়ে তুলেছেন এবং নিজে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন।
সন্তানের জন্য পিতা-মাতার নিঃশর্ত আত্মত্যাগ ও জীবনের চরম ঝুঁকি নেওয়ার এই স্বর্গীয় অনুভূতির দিক থেকে আসমানীর মা অবিকল সম্রাট বাবরেরই যোগ্য প্রতিচ্ছবি।
'উদ্দীপক-১:
"হোক না যত বড়ো বীর, রাজা জমিদার
সুন্দর নারী, সুন্দর বাড়ি, ঘড়ি ট্রানজিস্টার
একদিন আমি যে এই পৃথিবীর লোক ভুলে যাবে সবে।”
উদ্দীপক-২ :
"পথের ধারে বাজবে বেণু
নদীর কূলে চরবে ধেনু
আঙিনাতে খেলবে শিশু
পাখিরা গান গাবে।
তবুও দিন যাবে গো দিন যাবে।"
ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু ঘটলেও ভালোবাসা, সৃষ্টি ও সুন্দর জীবনের জন্য মানুষের সোনার স্বপ্নের সাধ কখনোই পৃথিবী থেকে নিঃশেষ হয়ে যায় না বোঝাতে কবি এ কথা বলেছেন।
জীবনানন্দ দাশের 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার অন্যতম গভীর দার্শনিক সত্য হলো মানবআকাঙ্ক্ষার অবিনশ্বরতা। এক প্রজন্ম চলে গেলে পরবর্তী প্রজন্ম আবার সেই স্বপ্নের বীজ বুনে। তাই ব্যক্তিগত জীবনের অবসান ঘটলেও মানুষের স্বপ্নের চিরন্তন ধারা পৃথিবীতে অনন্তকাল বেঁচে থাকে।
উদ্দীপক-১-এ রাজা-জমিদার, সুন্দর নারী ও পার্থিব ধনসম্পদের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং মৃত্যুর পর পৃথিবী থেকে মানুষের নাম ভুলে যাওয়ার যে বাস্তব সত্য ফুটে উঠেছে, তা 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মানবজীবনের নশ্বরতার দিকটিকে নির্দেশ করে।
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কীভাবে পরাক্রমশালী রাজা-বাদশাহ ও প্রতাপশালী সভ্যতাগুলো ধ্বংস হয়ে ধুলোয় মিশে যায়। মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না; মৃত্যুর সাথে সাথে পার্থিব অহংকারের পতন ঘটে।
উদ্দীপক-১-এও বীর, রাজা ও সুন্দর বাড়ির নশ্বরতা স্বীকার করে মানুষের অনিবার্য চিরবিদায়ের কথা বলা হয়েছে, যা কবিতার মৃত্যুচেতনার সাথেই একাত্ম।
মন্তব্যটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও যথার্থ। উদ্দীপক-২-এ মানুষের জীবনের দিন ফুরিয়ে গেলেও পথে বাঁশি বাজা, ধেনু চড়া ও পাখিদের গান গাওয়ার মাধ্যমে প্রকৃতির শাশ্বত রূপপ্রবাহের যে ছবি আঁকা হয়েছে, তা-ই মূলত 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল ভাবনা।
জীবনানন্দ দাশের কবিতার মূল সুর হলো— মানুষ চলে যায় কিন্তু প্রকৃতি থেমে থাকে না। চালতাফুলের গন্ধ তেমনি থাকবে, লক্ষ্মীপেঁচা গান গেয়ে যাবে এবং প্রকৃতির আনন্দধারা চিরকাল বহমান থাকবে।
উদ্দীপক-২-এও রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গানের চরণে বলা হয়েছে যে দিন চলে গেলেও বাঁশি বাজবে, শিশুরা খেলবে এবং পাখিরা গান গেয়ে যাবে।
মানুষের ক্ষণস্থায়িত্বের বিপরীতে পৃথিবীর চিরন্তন সৌন্দর্য ও জীবনের অনন্ত প্রবাহের এই দর্শন কবিতা ও উদ্দীপকে সমভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং, উদ্দীপক-২ কবিতার মূল ভাবনাকেই ধারণ করেছে।
দৃশ্যকল্প-১:
মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ
মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ্ ঠঙ্।
ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছ-পালা।
এ পারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিক জ্বালা।
দৃশ্যকল্প-২:
মম যূথীবনে শ্রাবণ মেঘের
সজল পরশ লেগেছে
তৃষ্ণাতুর মন অঙ্গনে যেন
প্রথম বর্ষা নেমেছে।
বর্ষার বৃষ্টির তোড়ে শুষ্ক ও ফেটে যাওয়া নদীর বুক জলে টইটম্বুর হয়ে ফসলের মাঠে নতুন জীবনের সজীবতা ও প্রাণের হিল্লোল বয়ে আনে বোঝাতে উক্তিটি করা হয়েছে।
শামসুর রাহমানের 'বৃষ্টি' কবিতায় বর্ষার সঞ্জীবনী শক্তির জয়গান গাওয়া হয়েছে। গ্রীষ্মের খরায় শুকিয়ে যাওয়া নদী যখন বৃষ্টির পানিতে পূর্ণ যৌবন লাভ করে, তখন তা তৃষ্ণার্ত প্রকৃতিতে প্রাণের প্লাবন নিয়ে আসে। প্রকৃতির এই নতুন প্রাণধারণকেই প্রাণের জোয়ার বলা হয়েছে।
দৃশ্যকল্প-১-এ মেঘের ওপর মেঘ জমা, রঙের বৈচিত্র্য এবং ওপারে ঝাপসা গাছপালা নিয়ে বৃষ্টি নেমে আসার যে চোখজুড়ানো চিত্র আঁকা হয়েছে, তার সাথে 'বৃষ্টি' কবিতার মেঘের কাজল ছায়া ও বর্ষার প্রাকৃতিক নিসর্গশোভা সরাসরি সাদৃশ্যপূর্ণ।
'বৃষ্টি' কবিতায় কবি আষাঢ়ের কালো মেঘ, আকাশ ছেয়ে যাওয়া এবং প্রকৃতির ওপর বৃষ্টির স্নিগ্ধ রূপের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।
দৃশ্যকল্প-১-এও রবীন্দ্রনাথের 'মেঘের কোলে রোদ হেসেছে' কবিতার সুরে মেঘ ও বৃষ্টির অপরূপ আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা শামসুর রাহমানের কবিতার প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যের সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ।
না, দৃশ্যকল্প-২-এর ভাব 'বৃষ্টি' কবিতার সমগ্র ভাবকে ধারণ করতে পারেনি; এটি কেবল বর্ষার রোমান্টিক বিরহ ও তৃষ্ণাতুর মনের একটি খণ্ডাংশকে প্রকাশ করেছে মাত্র।
'বৃষ্টি' কবিতাটিতে কবি কেবল বিরহী মনের আকুলতা তুলে ধরেননি; তিনি বর্ষাকে চিত্রিত করেছেন এক মহাজাগতিক ও বাস্তব জীবনমুখী শক্তি হিসেবে। সেখানে বৃষ্টির ধারায় মাটি উর্বর হয়, কৃষকের মুখে হাসি ফোটে, শুষ্ক নদী প্রাণ ফিরে পায় এবং সমগ্র ধরণী নতুন শক্তিতে জেগে ওঠে।
দৃশ্যকল্প-২-এ কেবল শ্রাবণের মেঘে বিরহী মনের তৃষ্ণা ও যূথীবনে প্রথম বৃষ্টির প্রেমের আকুতিটুকু প্রকাশ পেয়েছে। এতে প্রকৃতির পুনর্জন্ম, মাঠ-ঘাটের সজীবতা কিংবা সার্বজনীন জীবনচেতনার বিশালতা অনুপস্থিত।
সুতরাং, দৃশ্যকল্প-২ বৃষ্টির রোমান্টিক দিকের একটি সুন্দর প্রকাশ ঘটালেও 'বৃষ্টি' কবিতার সামগ্রিক প্রাণচাঞ্চল্য ও গভীরতাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
উদ্দীপক-১: মুহিত বরিশালে বেড়াতে যায়। একদিন খুব ভোরে লঞ্চঘাটে বেড়াতে গেলে অনেকেই তাকে দুষ্কৃতকারী মনে করে। লোকজন তার পরিচয় জানতে চাইলে সে ভয়ে তার নাম-ঠিকানা বলতে পারে না। লোকজনের সন্দেহ বেড়ে যায় এবং তাকে বেঁধে ফেলে। এমন সময় একজন পরিচিত লোক এসে তাকে সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার করে।
উদ্দীপক-২:
বন পেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে
এলাম সোনার গাঁয়
আমার আপন ঠিকানায়।
মায়ের আদর বোনের স্নেহ
সবুজ-শ্যামল গাঁয়
তাকি আমার হৃদয় জুড়ে যায়।
কবি কোনো অতিথি বা ক্ষণিকের পর্যটক নন, বরং তিনি এই মাটিরই আজীবনের চেনা সন্তান ও নাড়ির টানে আবদ্ধ চিরন্তন আপনজন— এই পরম সত্যকে শপথ করে প্রতিষ্ঠা করতেই কবি এ কথা বলেছেন।
আহসান হাবীবের 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার মূল ভাব হলো মাতৃভূমির সাথে গভীর আত্মিক সংযোগ। গ্রামের প্রকৃতি, শালিকের ডাক ও চেনা মানুষগুলোর সাথে তাঁর সম্পর্ক কোনো বাহ্যিক নয়; তিনি এই মাটিরই একজন। নিজের এই চিরন্তন আত্মপরিচয়ের অধিকার ঘোষণা করতেই তিনি খোদার কসম খেয়েছেন।
উদ্দীপক-১-এর মুহিত বরিশালে গিয়ে অপরিচিত দুষ্কৃতকারী সন্দেহে আটক হওয়া ও নিজের পরিচয় দিতে না পারার সাথে 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার কবির চিরচেনা ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানের সুস্পষ্ট বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতায় কবি নিজেকে সম্পূর্ণ চেনা ও পরিচিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে উঠোনের জারুল গাছ, মাছরাঙা ও নিঝুম রাতের বাঁশবাগান সবাই তাঁকে চেনে। তাঁর কোনো আত্মপরিচয়ের সংকট নেই।
পক্ষান্তরে, উদ্দীপক-১-এর মুহিত নতুন জায়গায় গিয়ে অপরিচিত হয়ে পড়ে এবং ভয়ে কথা বলতে না পেরে চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়। এই আত্মবিশ্বাস ও পরবাসী সংকটের দিক থেকেই উভয় চরিত্রের মাঝে বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।
হ্যাঁ, উদ্দীপক-২ 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার মূলভাব— অর্থাৎ ফেলে আসা জন্মভূমির শ্যামল রূপ ও চেনা ঠিকানায় ফিরে এসে নাড়ির বন্ধন অনুভব করার চিরন্তন আনন্দকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ধারণ করেছে।
আহসান হাবীব কবিতায় বলেছেন যে তিনি এই দেশেরই সন্তান, তাঁর অস্তিত্ব এই সবুজ প্রকৃতির মাঝেই গাঁথা। জন্মভূমির প্রকৃতি, মানুষের স্নেহ ও মাটির সুবাসই তাঁর আসল ঠিকানা।
উদ্দীপক-২-এও বন ও মাঠ পেরিয়ে নিজের আপন ঠিকানায় ফিরে আসা এবং মায়ের আদর ও বোনের স্নেহে হৃদয় ভরে ওঠার যে শাশ্বত সুর বেজে উঠেছে, তা কবির আত্মিক চেতনারই অবিকল প্রতিধ্বনি।
জন্মভূমিকে আপন ঠিকানা হিসেবে ভালোবাসা ও তৃপ্তি পাওয়ার এই দিকটিই উভয়ের মূল ভাবনা। সুতরাং, উদ্দীপক-২ কবিতার মূলভাবকে সার্থকভাবে প্রকাশ করেছে।
মেজর এজাজ কোনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়, বরং নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন, গ্রামবাসীকে ভয় দেখানো এবং গণহত্যার একটি কপট আইনি বৈধতা তৈরির মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল হিসেবে খুনের বিচারে অতি-উৎসাহী হয়েছিল।
মেজর এজাজ চেয়েছিল বিচারের প্রহসন সাজিয়ে গ্রামের সচেতন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলতে যাতে কেউ ভবিষ্যতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস না পায়। নিজের পাশবিকতাকে ন্যায়পরায়ণতার মুখোশে ঢেকে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আগ্রাসন যখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তখন নীলগঞ্জের মতো একটি নিভৃত ও শান্ত গ্রামও অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
শুরুতে নীলগঞ্জ ছিল একটি শান্ত নদী-মাতৃক জনপদ। কিন্তু ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প স্থাপন, নিরীহ মানুষ হত্যা, মা-বোনদের ওপর অত্যাচার ও অগ্নিসংযোগের ফলে গ্রামীণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। তখন কৃষক, শিক্ষক, কিশোর ও মা-বোনেরা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়, খাদ্য সরবরাহ করে এবং যুবকেরা অস্ত্র তুলে নিয়ে গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এভাবে সমগ্র গ্রামের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে একাত্তরের রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
বলাই হলো সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসের এক বিশ্বস্ত, সাহসী ও মাটির সাথে মিশে থাকা গ্রামীণ সাধারণ তরুণ চরিত্র।
বলাইয়ের সাথে রফিকের সম্পর্ক ছিল গভীর ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের গোপন কর্মকাণ্ডে একনিষ্ঠ সহযোদ্ধার সম্পর্ক। রফিক যখন গেরিলা আক্রমণ ও তথ্যের জন্য বিশ্বস্ত সহযোগীর সন্ধান করত, তখন বলাই নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে রফিকের নির্দেশ পালন করত। বলাই ছিল রফিকের এক পরম নির্ভরতার প্রতীক যার আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত।
“'১৯৭১' উপন্যাসের মূল উপজীব্য হলো মুক্তিযুদ্ধে নিপীড়িত সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণা”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উপন্যাসটিতে কোনো উচ্চবিত্ত রাজনীতি নয়, বরং মাটির সাধারণ মানুষের রক্তক্ষরণ ও আত্মত্যাগই প্রধান হয়ে উঠেছে।
উপন্যাসে দেখা যায়, যুদ্ধ কীভাবে কৃষক মীর আলির স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে, সাধারণ বধূ ও কুমারীদের জীবনকে নরকে পরিণত করেছে, বৃদ্ধ পিতামাতাকে সন্তানহারা করেছে এবং গোটা গ্রামকে এক শ্মশানে রূপ দিয়েছে। এই সাধারণ মানুষগুলোর না ছিল কোনো অস্ত্র, না ছিল নিরাপদ আশ্রয়; তবুও তারা নিজেদের রক্তের বিনিময়ে স্বদেশের জন্য লড়াই করেছে। এই অশ্রুসজল আত্মাহুতিই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।
উক্তিটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষের জীবনে যখন কোনো চরম বিপদ, ধ্বংস বা মৃত্যুভয় নেমে আসে, তখন সে সবার আগে নিজের পরিবার, ভাই-বোন ও রক্তের সম্পর্কের মানুষদের নিরাপত্তাই সবার আগে চিন্তা করে।
'১৯৭১' উপন্যাসে যখন পাকিস্তানি হানাদাররা গানবোট ও কামানের গোলাবর্ষণ করে নীলগঞ্জ গ্রামকে ছারখার করে দিচ্ছিল, তখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মানুষ সবার আগে নিজের সন্তান ও পরিবারের খোঁজ করতে থাকে। জীবনের চরম সংকটে রক্ত ও ভালোবাসার মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার চিরন্তন ব্যাকুলতা থেকেই এ কথা বলা হয়েছে।
সেলিনা হোসেনের '১৯৭১' উপন্যাসে রফিক ও মেজর এজাজের মধ্যকার টানাপোড়েন ছিল মূলত শোষিত বাঙালির স্বাধীনতার চেতনা বনাম পাকিস্তানি হানাদারদের ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক সংঘাত।
মেজর এজাজ চেয়েছিল রফিককে ব্যবহার করে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করতে। কিন্তু রফিক ছিলেন দেশপ্রেমে নিবেদিত এক অসম সাহসী মুক্তিসেনা। তিনি মেজরের ধূর্ত চক্রান্তের বিপরীতে নিজের সামরিক বুদ্ধি দিয়ে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং হানাদার ক্যাম্প ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন। এই দুই বিপরীতমুখী আদর্শের সংঘাতই উপন্যাসের কাহিনীকে চরম পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।
সেনবাড়িতে কোনোদিন সাধারণ চোর-ডাকাত আসার কথা ছিল না কারণ সেনপরিবার ছিল গ্রামের অত্যন্ত সম্মানিত, নিরহংকার ও দরিদ্র মানুষের আশ্রয়স্থল; তাই ডাকাতরাও তাঁদের শ্রদ্ধা করত।
সেনবাড়ির সদস্যরা গ্রামের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার বিপদে পাশে দাঁড়াতেন এবং সম্প্রীতি বজায় রাখতেন। কিন্তু একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকাররা তথাকথিত 'ডাকাতের' ছদ্মবেশে রাজনৈতিক হিংসায় এই বাড়িটিতে আক্রমণ চালিয়ে লুটপাট ও নির্যাতন শুরু করে। এটি সাধারণ ডাকাতি ছিল না, এটি ছিল পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্ট তাণ্ডব।
“অকারণ নিপীড়নই একটি যুদ্ধকে জনগণের মুক্তিযুদ্ধে উপনীত করেছিল”— উক্তিটি '১৯৭১' উপন্যাসের তিনটি প্রধান চরিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:
১. মীর আলি: একজন শান্ত ও নিরীহ গ্রামীণ পিতা যিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হানাদাররা যখন তাঁর ভিটা জ্বালিয়ে দেয় এবং সন্তানদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে, তখন তিনি ভীরুতা ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের পরম আশ্রয়ে পরিণত হন।
২. আজিজ মাস্টার: একজন শান্তিপ্রিয় শিক্ষক। পাকিস্তানি সেনারা যখন তাঁকে ধরে নিয়ে অপমান ও নির্যাতনের মুখে ফেলে, তখন তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে আত্মমর্যাদা নিয়ে বীরের মতো মৃত্যুকে বরণ করে সমগ্র গ্রামকে প্রতিরোধের মন্ত্রে দীক্ষিত করেন।
৩. অনুফা: এক সাধারণ গ্রামীণ তরুণী। হানাদারদের বর্বরতা ও নারীদের লাঞ্ছনা দেখে তার ভেতরের সুপ্ত দেশপ্রেম ও ক্ষোভ জ্বলে ওঠে এবং সে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহকারী এক নির্ভীক নারীতে রূপান্তরিত হয়।
এইভাবে পাকিস্তানি জান্তার অকারণ পাশবিকতাই সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে একতাবদ্ধ করে যুদ্ধটিকে একটি সর্বাত্মক 'গণযুদ্ধে' রূপ দিয়েছিল।