সুদ সমাজের ধনীদের অলস ও শোষকে পরিণত করে এবং দরিদ্রদের চরম নিঃস্ব ও ঋণের বেড়াজালে বন্দি করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ধ্বংস করে সামাজিক অবিচার তৈরি করে বলেই আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন।
সুদের কারণে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য মারাত্মক বৃদ্ধি পায়।
সোহাগ সাহেবের বিদেশে নানা সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নিজ দেশে ফিরে এসে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হওয়ার মাঝে আখলাকে হামিদাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ 'স্বদেশপ্রেম' (হুব্বুল ওয়াতন) ও 'দেশসেবা' ফুটে উঠেছে।
ইসলামে নিজের দেশকে ভালোবাসা ও দেশের মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা ঈমানের দাবি। সোহাগ সাহেব ব্যক্তিগত পার্থিব লোভের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত ও আলোকিত করার মহতী দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশপ্রেমের অনন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন।
মাতৃভূমির প্রতি এই গভীর টান ও সেবা প্রশংসনীয়।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— আবদুল কাদের সাহেবের 'এরূপ চরিত্রের অধিকারীগণ আল্লাহর নিকট সম্মানিত' মন্তব্যটি আখলাকে হামিদাহর মূল ভিত্তি 'তাকওয়া' (আল্লাহভীতি)-র আলোকে শতভাগ কুরআনসম্মত ও যথার্থ।
আশরাফ সাহেব আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকেন এবং ভালো কাজ করেন; যাকে শরিয়তে তাকওয়া বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন— 'নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকি/আল্লাহভীরু' (সুরা আল-হুজুরাত: ১৩)।
তাকওয়াবান ব্যক্তি সমাজকে যাবতীয় অন্যায় ও শোষণ থেকে মুক্ত রাখে। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে মুত্তাকিদের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা ও জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।
সুতরাং, আবদুল কাদের সাহেবের মন্তব্যটি পবিত্র কুরআনের ঘোষণার সাথে হুবহু সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম; ইসলামে কোনো নিরপরাধ মানুষ হত্যা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করায় ইসলাম সন্ত্রাসবাদকে কখনো সমর্থন করে না।
সন্ত্রাসবাদ সমাজের শান্তি ও মানবতা ধ্বংস করে।
আলী হোসেনের মাসব্যাপী রাতের শেষভাগে সাহরি খেয়ে সারাদিন সমস্ত পানাহার ও জৈবিক প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকার ফরজ কাজটি হলো ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ 'সাওম' (রোজা)।
সাওম হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিয়তের সাথে সকল প্রকার পানাহার থেকে বিরত থাকা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মশুদ্ধি অর্জন ও তাকওয়ার অনুশীলন করা (সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)।
আলী হোসেন এই মহান দৈহিক ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করছেন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— আজগরের দারিদ্র্য বিমোচন ও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে গৃহীত পরিকল্পিত ফরজ ইবাদতটি হলো ইসলামের অন্যতম প্রধান আর্থিক স্তম্ভ 'যাকাত'; সমাজ গঠনে তাঁর এই পরিকল্পনা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও দূরদর্শী।
যাকাত হলো ধনীদের নিসাব পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট ২.৫% হারে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের মাঝে বণ্টনের ঐশী বিধান। আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'তাদের সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের জন্য' (সুরা আল-মাআরিজ: ২৪-২৫)।
আজগরের মতো পরিকল্পিতভাবে যাকাত আদায় ও বণ্টন করলে দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়, বেকারত্ব দূর হয় এবং সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। এর ফলে সমাজ থেকে চিরতরে শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব।
সুতরাং, আজগরের পরিকল্পনা ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল দর্শনের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।
প্রেক্ষাপট-১: জনাব 'ক' একজন আধুনিক শিক্ষিত লোক। তিনি নিয়মিত সালাত, সাওম ও যাকাত আদায় করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রত্যেক যুগেই নবি-রাসুলদের আগমন প্রয়োজন।
প্রেক্ষাপট-২: জুমার দিন ইমাম সাহেব পরকালীন একটি স্তর নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, সেই ভয়ানক বিভীষিকাময় দিনে সকল মানুষের মাথার উপর সূর্য থাকবে এবং সকল মানুষ প্রচন্ড তাপে ঘামতে থাকবে।
কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে মহান আল্লাহ তায়ালা বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে উম্মতের পাপ মার্জনা ও জান্নাতে উচ্চমর্যাদা দানের জন্য সুপারিশ করার বিশেষ ক্ষমতা দান করবেন বোঝাতেই রাসুল (স.) এ কথা বলেছেন।
মহানবি (স.)-এর শাফাআতের মাধ্যমেই অগণিত মুমিন মুক্তি লাভ করবে।
জনাব 'ক'-এর নিয়মিত সালাত-সাওম আদায় করা সত্ত্বেও 'প্রত্যেক যুগেই নবি-রাসুলদের আগমন প্রয়োজন' বলে বিশ্বাস করা পাঠ্যবইয়ে আলোচিত আকাইদের অবিসংবাদিত স্তম্ভ 'খতমে নবুয়ত' (নবুয়তের সমাপ্তি)-এর সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
খতমে নবুয়তের অকাট্য আকিদা হলো— হযরত মুহাম্মদ (স.) হলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ ও চূড়ান্ত রাসুল। তাঁর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবি বা রাসুল আসবেন না (সুরা আল-আহযাব: ৪০)।
জনাব 'ক' নতুন নবির প্রয়োজনীয়তা বিশ্বাস করে কুরআনের সুস্পষ্ট অকাট্য বিধান অস্বীকার করেছে, যা তার সমস্ত ঈমান ও আমলকে বিনষ্ট করে দেয়।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— ইমাম সাহেবের বক্তব্যে উল্লিখিত সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপ ও ঘামে নিমজ্জিত হওয়ার দিনটি হলো 'হাশরের ময়দান'; এই কঠিন দিনের ভয়াবহতা থেকে নিষ্কৃতি লাভের কার্যকর উপায়সমূহ নিম্নে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. খাঁটি ঈমান ও নেক আমল: শিরক ও কুফরমুক্ত খাঁটি ঈমান নিয়ে নিয়মিত সালাত, সাওম, যাকাত আদায় এবং সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
২. তাকওয়া ও পাপ বর্জন: আল্লাহর ভয়ে দুনিয়ার যাবতীয় পাপাচার, জুলুম, দুর্নীতি ও পরনিন্দা থেকে মুক্ত থাকা।
৩. আরশের ছায়া লাভের আমল: হাদিসে বর্ণিত ন্যায়পরায়ণ শাসক, যৌবনে ইবাদতকারী যুবক, মসজিদের সাথে অন্তর লেগে থাকা ব্যক্তি, গোপনে দানকারী ও নির্জনে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকারীর গুণাবলি অর্জন করা; যা হাশরের দিন আরশের ছায়া এনে দেবে।
৪. রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ: রাসুল (স.)-এর সুন্নাহ মেনে চলা এবং বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা, যাতে তাঁর কাওসার ও শাফাআত নসিব হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাল যেমন শত্রুর আক্রমণ থেকে সৈনিককে রক্ষা করে, সাওমও তেমনি মুমিন বান্দাকে শয়তানের প্ররোচনা, পাপ ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে বলেই হাদিসে সাওমকে ঢাল বলা হয়েছে।
সাওম অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে।
জনাব আলিফের নির্বাচনে জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন ও দান-সদকা করার মাঝে মহানবি (স.)-এর সুপ্রসিদ্ধ 'নিয়তের বিশুদ্ধতা ও রিয়া বর্জন সংক্রান্ত' হাদিসের শিক্ষা লঙ্ঘিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'ইন্নামাল আমালু বিন নিয়্যাত' অর্থাৎ নিশ্চয়ই সকল কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল (সহিহ বুখারি)। কোনো ভালো কাজ যদি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়ে লোকদেখানো বা সুনাম কুড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা রিয়া বা ছোট শিরকে পরিণত হয় এবং তার সমস্ত সাওয়াব বিনষ্ট হয়ে যায়।
আলিফ সাহেব পার্থিব স্বার্থে দান করে ধর্মীয় নীতি লঙ্ঘন করেছেন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— ছগির সাহেবের সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণের প্রেক্ষিতে ইমাম সাহেবের মন্তব্যটি মহানবি (স.)-এর 'বৃক্ষরোপণ ও সদকায়ে জারিয়া সংক্রান্ত' হাদিসের আলোকে শতভাগ যথার্থ।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা চতুষ্পদ প্রাণী ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে' (সহিহ বুখারি)। তিনি আরও বলেছেন— যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।
বৃক্ষ রোপণের ফলে দুনিয়াতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়, ছায়া ও ফল পাওয়া যায় এবং পরকালে রোপণকারীর মৃত্যুর পরও কবরে অবিরাম সাওয়াব জারি থাকে।
অতএব, বৃক্ষরোপণে দুনিয়া ও আখিরাতের অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত থাকার বক্তব্যটি সম্পূর্ণ নির্ভুল।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চরিত্র ছিল পবিত্র কুরআনের বাস্তব রূপ এবং মহান আল্লাহ তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন বলেই তাঁর জীবনাদর্শ অনুকরণীয়।
তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ ছাড়া দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা আসে না।
প্রধান অতিথি তাঁর আলোচনায় রাজদরবারে গিয়ে হাদিস শেখানোর প্রস্তাব আত্মমর্যাদাবোধের কারণে প্রত্যাখ্যানকারী যে মনীষীর প্রতি প্রথমত ইঙ্গিত করেছেন, তিনি হলেন হাদিসসম্রাট 'ইমাম বুখারি (র.)' (১৯৪-২৫৬ হি.)।
বুখারার তৎকালীন শাসক খালিদ ইবনে আহমদ ইমাম বুখারি (র.)-কে রাজপ্রাসাদে এসে তাঁর সন্তানদের হাদিস পড়ানোর নির্দেশ দিলে ইমাম বুখারি (র.) ইলমের সম্মান রক্ষার্থে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন— 'আমি ইলমকে অপদস্থ করতে পারি না; যার প্রয়োজন সে মসজিদে এসে পড়বে।' এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গভর্নর তাঁকে নির্বাসিত করেন।
ইমাম বুখারি (র.) জ্ঞানের আত্মমর্যাদা রক্ষার এক চিরন্তন প্রতীক।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— প্রধান অতিথি দ্বিতীয়ত বোর্ড গঠনের মাধ্যমে ইসলামি আইন সংকলনকারী এবং বিচারপতির পদ প্রত্যাখ্যানকারী যে জ্ঞানীর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, তিনি হলেন মহান ফকিহ 'ইমাম আবু হানিফা (র.)' (৮০-১৫০ হি.); ফিকহশাস্ত্রে তাঁর অবদান অবিসংবাদিত।
ইমাম আবু হানিফা (র.) ছিলেন ফিকহশাস্ত্রের জনক ও হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ইসলামি আইনকে সুবিন্যস্ত করতে ৪০ জন শীর্ষ মুজতাহিদের সমন্বয়ে একটি ফিকহ বোর্ড গঠন করেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর গবেষণা করে তাঁরা কুরআন, সুন্নাহ ও কিয়াসের ভিত্তিতে তৎকালীন ও ভবিষ্যৎ জীবনের প্রায় ৮৩ হাজার আইনি সমস্যার সমাধান সংকলন করেন।
শাসক মানসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতির (কাজি উল কুযাত) পদ দিতে চাইলে তিনি স্বাধীনভাবে ফতোয়া দেওয়ার স্বার্থে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং কারাবরণ করেন। তাঁর এই অনন্য গবেষণার ফলেই ইসলামি আইন যুগে যুগে প্রয়োগযোগ্য রূপ লাভ করেছে।
সুতরাং, ফিকহশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর অবদান ইসলামের ইতিহাসে চিরভাস্বর।
কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তায়ালা মিজান স্থাপন করে প্রতিটি মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভালো ও মন্দ কাজের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ বিচার করবেন বোঝাতেই পবিত্র কুরআনে এ কথা বলা হয়েছে।
এদিন কারো ওপর তিল পরিমাণ জুলুম করা হবে না।
জহিরের বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহর আদেশ ও রাসুল (স.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে পরকালে অর্জিত শান্তির আবাসস্থলটি হলো 'জান্নাত'।
জান্নাত হলো এমন এক চিরস্থায়ী সুখের নীড় যেখানে দুধ, মধু ও সুপেয় পানির নহর প্রবাহিত। সেখানে সুন্দর প্রাসাদ, চিরসবুজ উদ্যান, সুস্বাদু ফলমূল এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর দিদার ও সন্তুষ্টি বিরাজ করবে। জান্নাতে কোনো দুঃখ, কষ্ট, বার্ধক্য বা মৃত্যু থাকবে না; মুমিনগণ সেখানে চিরকাল অফুরন্ত আনন্দে বসবাস করবেন।
জহির খাঁটি মুমিনের মতো এই চিরস্থায়ী পরম প্রাপ্তির প্রতিই আশা পোষণ করেছে।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— রমিজের ইসলাম বিরোধিতা ও পার্থিব মোহগ্রস্ততার প্রেক্ষিতে শিক্ষকের 'পরকালে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করবে' মন্তব্যটি শতভাগ যথার্থ ও কুরআন-সুন্নাহর সতর্কবাণীর সাথে হুবহু সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে পার্থিব মোহে অন্ধ হয়ে দ্বীন প্রত্যাখ্যানকারীদের চরম সতর্ক করে বলেছেন— 'যারা আখিরাতের চেয়ে পার্থিব জীবনকে বেশি ভালোবাসে এবং আল্লাহর পথে বাধা দেয়, তারা চরম বিভ্রান্তিতে রয়েছে' (সুরা ইব্রাহিম: ৩)।
রমিজের মতো যারা আল্লাহর বিধান অস্বীকার করে এবং ইসলামের শত্রুতা করে, পরকালে তাদের একমাত্র ঠিকানা হবে জাহান্নামের লেলিহান অগ্নিকুণ্ড। সেখানে তাদের খাদ্য হবে কাঁটাযুক্ত যাক্কুম এবং পানীয় হবে ফুটন্ত পুঁজ ও পানি।
সুতরাং, শিক্ষকের মন্তব্যটি রমিজের আত্মশুদ্ধি ও পরকালীন মুক্তির জন্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সঠিক দিকনির্দেশনা।
মুত্তাকি ব্যক্তিরা সর্বদা আল্লাহর ভয়ে পাপ বর্জন করে এবং সৎপথে জীবন পরিচালনা করে আল্লাহর নির্দেশিত পথে অটল থাকেন বলেই আল্লাহ তাঁদের ভালোবাসেন।
মুত্তাকিদের জন্যই পরকালে জান্নাতের স্থায়ী নিয়ামত নির্ধারিত।
জনাব রকিবের চুক্তি মোতাবেক কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন-ভাতা না দেওয়া এবং বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার আচরণে 'ওয়াদা ভঙ্গ, আমানতের খেয়ানত ও শ্রমিকের হক নষ্ট করার' মারাত্মক পাপ প্রকাশ পেয়েছে।
ইসলামে কর্মচারীর ন্যায্য পাওনা যথাসময়ে প্রদান করা এবং কৃত চুক্তি রক্ষা করা অপরিহার্য কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন— 'শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো' (ইবনে মাজাহ)। তিনি আরও বলেছেন— ওয়াদা ভঙ্গ করা মুনাফিকের লক্ষণ।
রকিব সাহেব মালিক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব অবহেলা করে শ্রমিকদের ওপর জুলুম করেছেন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— সফিকের রকিবের অনুপস্থিতিতে মানুষের কাছে তার দোষ-ত্রুটি বলে বেড়ানোর কর্মটি হলো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ জঘন্যতম কবিরা গুনাহ 'গিবত' (পরনিন্দা); এর কুফল ও পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'তোমরা পরস্পরের গিবত করো না; তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো' (সুরা আল-হুজুরাত: ১২)। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'গিবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক পাপ' (মিশকাত)।
গিবতের কারণে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়, শত্রুতা ও কলহের সৃষ্টি হয় এবং ব্যক্তির সমস্ত নেক আমলের সাওয়াব ধ্বংস হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন যার গিবত করা হয়েছে সে ক্ষমা না করলে আল্লাহও তা মাফ করবেন না।
সুতরাং, সফিকের উচিত অবিলম্বে এই জঘন্য পাপ বর্জন করে আল্লাহর কাছে তাওবা করা।
কুরআন মাজিদ তাড়াহুড়ো না করে তাজবিদসহ হরফের বিশুদ্ধ উচ্চারণ, ওয়াকফ ও অর্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে সুস্পষ্টভাবে তিলাওয়াত করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা এ কথা বলেছেন।
ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করলে অন্তরে কুরআনের ভাবার্থ প্রবেশ করে।
জনাব আতিকের ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে যুবকদের উপহাস ও হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাটি পবিত্র কুরআনের ১১১তম সুরা 'সুরা আল-লাহাব' (বা আল-মাসাদ)-এর প্রেক্ষাপট ও মহানবি (স.)-এর জীবনের সাথে চমৎকারভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাফা পাহাড়ে মহানবি (স.) যখন মক্কার মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন, তখন তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব তাঁকে 'তাব্বাল্লাকা' (তোমার ধ্বংস হোক) বলে বিদ্রুপ করেছিল এবং পাথর নিক্ষেপ করেছিল। এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ সুরা আল-লাহাব নাজিল করে ইসলামের শত্রুর ধ্বংস ঘোষণা করেন।
জনাব আতিক সত্যের পথে ধৈর্য ধারণ করে নবিগণের ত্যাগের সুন্নাহ পালন করছেন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— জনাব আরফানের পঠিত সুরাটি হলো পবিত্র কুরআনের ৯৫তম সুরা 'সুরা আত-তীন'; এই সুরার আলোকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখে পশুত্বের অধঃপতন রোধে মানুষের করণীয়গুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. খাঁটি ঈমান আনয়ন: সুরা আত-তীনের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন— 'ইল্লাল্লাযীনা আমানূ' অর্থাৎ কেবল তারাই অধঃপতন থেকে মুক্ত থাকবে যারা আল্লাহর ওপর খাঁটি ঈমান আনবে।
২. সৎকর্ম সম্পাদন (আমলে সালেহ): ঈমানের সাথে সাথে সালাত, সাওম, ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা ও সমাজকল্যাণমূলক সৎকাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
৩. কুপ্রবৃত্তি ও পাপ বর্জন: হিংসা, লোভ, ব্যভিচার, জুলুম ও অনাচার বর্জন করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হবে; অন্যথায় মানুষ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্তরে নেমে যায়।
৪. আখিরাতের জবাবদিহিতা: শেষ বিচার দিবসের বিশ্বাস অন্তরে জাগ্রত রেখে নৈতিক জীবন পরিচালনা করতে হবে।
সুতরাং, সুরা আত-তীনের নির্দেশনা মেনে ঈমান ও সৎকর্মে অটল থাকাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার একমাত্র উপায়।
ইমান অর্থ অন্তরের গভীর বিশ্বাস এবং ইসলাম অর্থ আল্লাহর নির্দেশের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও বাহ্যিক কর্মে আনুগত্য প্রদর্শন।
ইমান হলো গাছের মূল বা শিকড়ের মতো আর ইসলাম হলো তার কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও ফলের মতো। অন্তরে ইমান না থাকলে কোনো আমল কবুল হয় না, আবার আমল ও আনুগত্য ছাড়া ইমানের পূর্ণতা প্রকাশ পায় না। তাই ইমান ও ইসলাম পরস্পর অবিচ্ছেদ্য ও পরিপূরক।
আখিরাত বা পরকালের চিরন্তন জীবনে বিশ্বাস ঈমানের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
আখিরাতে বিশ্বাস মানুষকে দুনিয়ায় জবাবদিহিমূলক, সত্যবাদী ও পুতপবিত্র জীবনযাপনে বাধ্য করে। যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে কিয়ামতের দিন প্রতিটি ভালো ও মন্দ কাজের জন্য আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, সে কখনোই অন্যায়, দুর্নীতি বা জুলুমে লিপ্ত হতে পারে না। ফলে সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
মানবজাতিকে অজ্ঞতা, পৌত্তলিকতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর তাওহিদের পথে পরিচালিত করার জন্য নবি-রাসুলগণকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
তাঁরা মানুষকে সত্য-মিথ্যা ও হালাল-হারামের সীমারেখা শিখিয়েছেন, উত্তম চরিত্রের বাস্তব আদর্শ প্রদর্শন করেছেন এবং পরকালীন জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের আজাব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
ইসলামি শরিয়ত হলো মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মানুষের সামগ্রিক ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার নিখুঁত জীবনবিধান।
শরিয়তের বিধান অনুসরণের মাধ্যমে মানুষের পার্থিব জীবনে ন্যায়বিচার, সমতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরকালে চিরন্তন মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব হয়। শরিয়তহীন জীবন চরম বিশৃঙ্খলা ও অধঃপতন ডেকে আনে।
তাজবিদ অর্থ আরবি হরফের মাখরাজ (উচ্চারণের স্থান) ও সিফাত (উচ্চারণের বৈশিষ্ট্য) যথাযথভাবে মেনে শুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন পাঠ করা।
আরবি ভাষায় সামান্য উচ্চারণের ভুলে শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা অনেক সময় মারাত্মক কুফরিতে রূপ নিতে পারে এবং সালাত নষ্ট করে দিতে পারে। এ কারণেই তাজবিদ মেনে বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা আবশ্যক।
হারাম খাদ্য ও অবৈধ উপার্জন মানুষের আত্মিক পবিত্রতা নষ্ট করে এবং অন্তরে পাপাচারের প্রবণতা বৃদ্ধি করে।
হারাম উপার্জনে পুষ্ট শরীরের কোনো ইবাদত বা দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'যে দেহ হারাম খাদ্যে গঠিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না; জাহান্নামই তার উপযুক্ত স্থান' (তিরমিজি)।
ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক হওয়া উচিত স্নেহ, মায়া, পরম শ্রদ্ধা ও আত্মিক ভালোবাসার।
শিক্ষক ছাত্রকে সন্তানের মতো স্নেহ দিয়ে দ্বীনি ও নৈতিক জ্ঞানে আলোকিত করবেন এবং ছাত্র শিক্ষককে আজীবন পরম শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আনুগত্য প্রদর্শন করবে। শিক্ষকের প্রতি বিনয় ও কৃতজ্ঞতাবোধ ছাড়া শিক্ষার বরকত অর্জন করা যায় না।
ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। জ্ঞান হলো অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করার ঐশী আলো।
জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর পরিচয়, তাওহিদ ও হালাল-হারাম অনুধাবন করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন' (সহিহ মুসলিম)।
শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে মহানবি (স.) ইরশাদ করেছেন— 'তোমরা শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করো' (ইবনে মাজাহ)।
এই হাদিসের শিক্ষা হলো— শ্রমিকের কাজের ন্যায্য মজুরি কোনো প্রকার টালবাহানা বা বিলম্ব না করে অবিলম্বে বুঝিয়ে দিতে হবে। শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখা বা কম দেওয়া ইসলামে চরম জুলুম।
আমর বিল মারুফ বা সৎকাজের আদেশ দেওয়া হলো একটি পরিচ্ছন্ন, দুর্নীতিমুক্ত ও আদর্শ সমাজ গঠনের মূল চালিকাশক্তি।
যখন সমাজের মানুষ পারস্পরিক কল্যাণে একে অপরকে ভালো কাজের উপদেশ দেয়, তখন সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা বৃদ্ধি পায়। এটি বর্জন করলে সমাজে পাপাচার বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহর গজব নেমে আসে।
গিবত বা পরনিন্দা মানুষের সম্মানহানি ঘটায় এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করে হিংসা-বিদ্বেষের জন্ম দেয়।
পবিত্র কুরআনে গিবতকে নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো নিকৃষ্ট পাপ বলা হয়েছে (সুরা আল-হুজুরাত: ১২)। হাদিসে একে ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক বলা হয়েছে। তাই ব্যক্তি ও সমাজের সুরক্ষায় গিবত চিরতরে পরিত্যাগ করা উচিত।
প্রাক-ইসলামি আরবের যুগকে 'আইয়ামে জাহেলিয়াত' বলা হয়। এ যুগে সমাজে কোনো আইন বা শৃঙ্খলা ছিল না; ব্যভিচার, মদ্যপান, জুয়া, দুর্বলদের শোষণ এবং কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো বর্বরতা প্রচলিত ছিল।
তুচ্ছ কারণে বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলত এবং নারীদের ভোগের সামগ্রী ও মর্যাদাহীন মনে করা হতো।
ইমাম শাফেয়ী (র.) ফিকহশাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর অনন্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে বলেছিলেন— 'ফিকহশাস্ত্রে সকল মানুষই ইমাম আবু হানিফার সন্তানতুল্য (বা মুখাপেক্ষী)।'
কারণ ইমাম আবু হানিফা (র.) সর্বপ্রথম ফিকহশাস্ত্রকে সুবিন্যস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন এবং কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে মানবজীবনের হাজার হাজার জটিল সমস্যার পদ্ধতিগত সমাধান লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর মহানবি (স.) তাঁর ওপর দীর্ঘ বছর ধরে নির্মম অত্যাচার চালানো মক্কার কুরাইশদের উদ্দেশ্যে এই ঐতিহাসিক ক্ষমার বাণী ঘোষণা করেছিলেন।
তিনি তাদের কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বলেছিলেন— 'আজ তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।' এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে ক্ষমার সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
ইমান হলো অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস আর ইসলাম হলো সেই বিশ্বাসকে বাস্তব কর্ম, ইবাদত ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা।
অন্তরের ঈমান তখনই দৃশ্যমান ও সার্থক হয় যখন বান্দা সালাত, সাওম, যাকাত ও নেক আমল পালন করে। তাই অন্তরের অদৃশ্য বিশ্বাসের দৃশ্যমান বাস্তব রূপই হলো ইসলাম।