দৃশ্যপট-১ : আকরাম সাহেব একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি তাকে দশ গুণ বেশি বেতনে চাকরির জন্য আহ্বান করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। দেশের জন্য কাজ করতে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী।
দৃশ্যপট-২ : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে অনেকেই পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে। জাত-বংশ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এমনকি কারও চরিত্র নিয়েও সমালোচনা করে।
সাওম বা রোজা মুমিন বান্দাকে যাবতীয় পাপাচার, অন্যায়, অশ্লীলতা ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে এবং অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাজত করে বলেই মহানবি (স.) সাওমকে ঢালস্বরূপ বলেছেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাল যেমন সৈনিককে শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করে, সাওমও তেমনি মুমিনকে পাপ ও জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করে।
জনাব আকরাম সাহেবের দশ গুণ বেশি বেতনের বিদেশি লোভনীয় চাকরি প্রত্যাখ্যান করে স্বদেশে থেকে সেবা করার সিদ্ধান্তে আখলাকে হামিদাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ 'দেশপ্রেম' (হুব্বুল ওয়াতন) ফুটে উঠেছে।
ইসলামে স্বদেশপ্রেমকে অত্যন্ত মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) মক্কা থেকে হিজরতের সময় বারবার ফিরে তাকিয়ে জন্মভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসার আবেগ প্রকাশ করেছিলেন। দেশের স্বাধীনতা রক্ষা, উন্নয়ন ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করা প্রতিটি মুমিনের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।
আকরাম সাহেব ব্যক্তিগত আর্থিক প্রাচুর্যের হাতছানি উপেক্ষা করে দেশের সেবায় নিয়োজিত থেকে খাঁটি দেশপ্রেমিকের পরিচয় দিয়েছেন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— দৃশ্যপট-২ এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা, জাত-বংশ নিয়ে বিদ্রূপ ও পরনিন্দার মতো সামাজিক পাপের বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে; ইসলামি শরিয়তে এ ধরনের আচরণ কঠোরভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষকে উপহাস না করে... এবং তোমরা পরস্পরের গিবত করো না' (সুরা আল-হুজুরাত: ১১-১২)। কারো বংশমর্যাদা নিয়ে কটাক্ষ করা এবং চরিত্রহনন করা ইসলামি নীতিশাস্ত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ফেসবুক বা ইন্টারনেটে কারো গোপন ত্রুটি প্রচার করা সমাজে পারস্পরিক শত্রুতা, ঘৃণা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় দিয়ে বলেছেন— যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে, সে-ই প্রকৃত মুসলিম।
অতএব, দৃশ্যপট-২ এর এহেন অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সত্য ও ন্যায়ের প্রচারে ব্যবহার করাই ইসলামের অকাট্য বিধান।
সুদের মাধ্যমে ধনীরা বিনা পরিশ্রমে দরিদ্রদের রক্ত পানি করা উপার্জন শোষণ করে সমাজে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, জুলুম ও অমানবিকতা সৃষ্টি করে বলেই মহান আল্লাহ সুদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছেন।
সুদ মানুষের মধ্যকার সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করে পরজীবী মানসিকতা তৈরি করে।
তামজিদের ভালো ফলের সাথে নষ্ট ফল মিশিয়ে ক্রেতাকে ধোঁকা দিয়ে বিক্রি করার কর্মকাণ্ড মহানবি (স.)-এর 'প্রতারণামূলক ব্যবসা ও ধোঁকাবাজি নিষিদ্ধ সংক্রান্ত' হাদিসের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
একদা রাসুলুল্লাহ (স.) বাজারে খাদ্যশস্যের স্তূপে হাত প্রবেশ করিয়ে ভেজা শস্য দেখতে পেয়ে বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করেন। বিক্রেতা বৃষ্টির অজুহাত দিলে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন— 'তুমি তা উপরে রাখলে না কেন যাতে মানুষ দেখতে পায়? যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়' (সহিহ মুসলিম)।
তামজিদও অসদুপায়ে পণ্যের ত্রুটি গোপন রেখে ক্রেতাকে ঠকিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর এই মৌলিক হাদিসের নির্দেশনা অমান্য করেছে।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— তাহমিদের কর্মকাণ্ডে আখলাকে হামিদাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ 'ব্যবসায় সততা ও আমানতদারি' ফুটে উঠেছে; নৈতিক জীবন গঠনে এই গুণের প্রভাব অপরিসীম।
ইসলামে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবসাকে অত্যন্ত উচ্চমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত আমানতদার ব্যবসায়ী পরকালে নবি, সিদ্দিক ও শহীদগণের সাথে থাকবে' (তিরমিজি)। সততা মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করে এবং অবৈধ উপার্জনের মোহ থেকে মুক্ত রাখে।
ব্যবসায় সততা বজায় রাখলে সমাজে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পায়, ভোক্তারা ন্যায্যমূল্যে খাঁটি পণ্য পায় এবং সমাজ থেকে প্রতারণা, মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট দূর হয়। এটি ব্যক্তির আত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটায় এবং সমাজকে শান্তিময় করে তোলে।
সুতরাং, তাহমিদের মতো ব্যবসায় সততা ও আমানতদারি রক্ষা করাই একটি সুশৃঙ্খল নৈতিক সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি।
কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মধ্যে কোনো নতুন বিষয়ের সুস্পষ্ট সমাধান পাওয়া না গেলে মূল উৎসের সাথে কার্যকর কারণ বা ইল্লতের হুবহু সাদৃশ্য বিচার করে শরিয়তের বিধান নির্ণয় করাই হলো কিয়াসের মূল নীতি।
মূল ভিত্তি (আসল), শাখা (ফর'অ), কার্যকর কারণ (ইল্লত) এবং মূল বিধান (হুকুম)—এই চারটির নিখুঁত সমন্বয়ে কিয়াস গঠিত হয়।
ময়না পাড়ের সফল নদীভাঙন রোধের অভিজ্ঞতাকে সাদৃশ্য হিসেবে গ্রহণ করে ভরনিয়ায় বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াটি ইসলামি শরিয়তের চতুর্থ উৎস 'কিয়াস' (আইনি সাদৃশ্যমূলক অনুমান)-এর সাথে চমৎকারভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে কোনো নতুন সমস্যার সমাধানে পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠিত বিধানের মূল কারণ বা ইল্লতের সাথে নতুন বিষয়ের কার্যকারণ তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াকে কিয়াস বলে। কিয়াসের মূল ভিত্তি হলো পূর্বদৃষ্টান্ত ও যৌক্তিক কারণের সামঞ্জস্য।
এখানে ময়না পাড়ের নদীভাঙনের বাস্তবতা ও বাঁধ নির্মাণের উপযোগিতা বিচার করে একই কারণে ভরনিয়ার জন্য বাঁধ মঞ্জুর করার পদ্ধতিটি হুবহু কিয়াসের নিয়মনীতির প্রতিফলন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে মসজিদ ডুবে যাওয়ায় লঞ্চে জুমার সালাত আদায়ের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তটি শরিয়তের তৃতীয় উৎস 'ইজমা' (ঐকমত্য)-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং মাওলানা আহমেদের মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ।
মহানবি (স.)-এর ওফাতের পর কোনো যুগের মুজতাহিদ ফকিহগণ যখন শরিয়তের কোনো বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তাকে শরিয়তের পরিভাষায় ইজমা বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'আমার উম্মত কখনো কোনো ভ্রান্ত বিষয়ে একমত হবে না' (তিরমিজি)।
বন্যার কারণে উদ্ভূত বিশেষ সংকটে সব ইমামের সর্বসম্মত সম্মতিক্রমে লঞ্চে জুমার নামাজ আদায় করে সালাতের মতো ফরজ বিধান কার্যকর রাখা হয়েছে। এই যৌথ ও সর্বসম্মত ফতোয়া মুসলমানদের বিপদে ধর্মীয় কর্তব্য পালনের এক অনন্য সুন্দর পথ উন্মোচন করেছে।
অতএব, আপদকালীন পরিস্থিতিতে ফকিহদের ইজমার মাধ্যমে সহজ সমাধান গ্রহণ আল্লাহর বিশেষ রহমতেরই বহিঃপ্রকাশ।
শরিয়ত হলো মানুষের পার্থিব ও পরকালীন জীবনের একমাত্র নির্ভুল স্বর্গীয় দিকনির্দেশনা ও জীবনবিধান; আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে শরিয়তের অনুশাসন মেনে চলা অপরিহার্য।
শরিয়তের বিধান মান্য করার মাধ্যমেই সমাজে ন্যায়বিচার, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
জামানের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও কেবল সামাজিক লোকলজ্জা বা মেজবানের অনুরোধে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করার মাঝে 'সুরা আল-মাউন'-এর লোকদেখানো সালাত আদায়কারীদের সতর্কবার্তার শিক্ষা লঙ্ঘিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের সুরা আল-মাউনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'ফাওয়া ইলুল লিল মুসল্লিন, আল্লাযিনা হুম আন সালাতিহিম সাহুন, আল্লাযিনা হুম ইউরাউন' অর্থাৎ অতএব সেইসব সালাত আদায়কারীর জন্য দুর্ভোগ, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন এবং যারা লোকদেখানোর জন্য তা করে (আয়াত: ৪-৬)।
জামান অন্তরের আন্তরিক ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে লোকদেখানো অনিচ্ছুক সালাত আদায় করে সুরা আল-মাউনের মৌলিক তাগিদ ও ইখলাসকে ভঙ্গ করেছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— সেজান সাহেবের শত আর্থিক সংকটের মাঝেও সততা বজায় রাখার পর সহকর্মী ফারজানার 'শীঘ্রই আপনার জীবনে সুখ আসবে' মন্তব্যটি পবিত্র কুরআনের 'সুরা আল-ইনশিরাহ'-এর অমূল্য ঐশী বাণীর সাথে হুবহু সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুরা আল-ইনশিরাহে মহান আল্লাহ তায়ালা পরম সান্ত্বনা ও আশার বাণী ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন— 'ফাইন্না মাআল উসরি ইউসরা, ইন্না মাআল উসরি ইউসরা' অর্থাৎ নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি (আয়াত: ৫-৬)। এই সুরায় আল্লাহ আশ্বস্ত করেছেন যে কোনো বান্দা যখন ধৈর্য ও সততার সাথে কষ্টের পথ পাড়ি দেয়, আল্লাহ তার জন্য স্বাচ্ছন্দ্য ও কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।
সেজান সাহেব স্বল্প বেতনের চাকরি করেও অন্যায়ের সাথে আপস না করে যে সততার পথ বেছে নিয়েছেন, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাঁর এই কষ্টের অবসান ঘটিয়ে জীবনে প্রাচুর্য ও বরকত দান করবেন। ফারজানা সুরা ইনশিরাহের এই চিরায়ত মহাসত্যকেই ব্যক্ত করেছেন।
সুতরাং, ফারজানার মন্তব্যটি কুরআনিক শিক্ষার আলোকে চরম সত্য, বাস্তব এবং গভীর অনুপ্রেরণাদায়ী।
হযরত মুহাম্মদ (স.) হলেন আল্লাহ প্রেরিত নবি-রাসুলগণের ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবি; তাঁর মাধ্যমে নবুয়তের ধারাক্রম চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে বলেই তাঁকে 'খাতামুন নাবিয়্যিন' বা নবিগণের সমাপ্তকারী বলা হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন— মুহাম্মদ (স.) তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবি (সুরা আল-আহযাব: ৪০)।
জনাব 'X'-এর পশুপালের লালন-পালনে একক স্রষ্টার বাইরে ফেরেশতাদের অংশীদারিত্বের কথা বলার মাধ্যমে ইসলামে চরম ক্ষমার অযোগ্য পাপ 'শিরক' (আল্লাহর ক্ষমতায় অংশীদার স্থাপন) প্রকাশ পেয়েছে।
তাওহিদ বা একত্ববাদের মূল শিক্ষা হলো— নিখিল জাহানের সৃষ্টি, লালন-পালন, নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্বের একক মালিক কেবল মহান আল্লাহ। ফেরেশতারা আল্লাহর সৃষ্টির হুকুমের অধীন অনুগত কর্মচারী মাত্র, তারা কখনোই স্রষ্টা বা পালনকর্তার অংশীদার হতে পারে না। আল-কুরআনে শিরককে 'সবচেয়ে বড় জুলুম' বলা হয়েছে।
জনাব 'X' স্রষ্টার রুবুবিয়্যাত বা লালন-পালনের ক্ষমতায় অংশীদার কল্পনা করে চরম ভ্রষ্টতা ও শিরকে লিপ্ত হয়েছেন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— জনাব 'Y'-এর ছোট ভাইকে সাইকেল কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তীতে তা পূরণ না করে গড়িমসি করার কর্মকাণ্ডে 'ওয়াদা ভঙ্গ ও মুনাফিকির চরিত্র' ফুটে উঠেছে; আখিরাত ও দুনিয়ায় এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (স.) মুনাফিকের তিনটি প্রধান লক্ষণ বর্ণনা করেছেন— 'যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখলে খেয়ানত করে' (সহিহ বুখারি)। ওয়াদা ভঙ্গ করা কবিরা গুনাহ এবং এটি ব্যক্তির সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে দেয়।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন— 'তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো, নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে' (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৪)। পরকালে মুনাফিকদের পরিণতি হবে অত্যন্ত নিকৃষ্ট এবং আল্লাহ ঘোষণা করেছেন মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।
অতএব, জনাব 'Y'-এর উচিত অবিলম্বে ছোট ভাইয়ের কাছে কৃত ওয়াদা পূরণ করে আল্লাহর কাছে তাওবা করা।
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর সত্তা, গুণাবলি, ক্ষমতা ও মহত্ত্বে একক ও অদ্বিতীয়; তাঁর কোনো রূপ, আকার বা বৈশিষ্ট্যের সাথে কোনো সৃষ্টির বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য বা তুলনা চলে না বোঝাতেই বলা হয়েছে— 'লাইসা কামিসলিহি শাই' অর্থাৎ কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।
আল্লাহ তায়ালা স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে এক চিরঞ্জীব ও অতুলনীয় মহাশক্তি।
সাকিবের পিতার আকস্মিক মৃত্যু দেখে সমস্ত অপকর্ম পরিত্যাগ করে খাঁটি ও পবিত্র জীবনযাপন শুরু করার মাঝে আকাইদের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ 'আখিরাত ও মৃত্যুর জবাবদিহিতায় দৃঢ় বিশ্বাসের' প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিটি কাজের হিসাব দিয়ে জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা পেতে হবে, তখন সে পাপের পথ ছেড়ে পুণ্যের পথে ফিরে আসে। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'জ্ঞানী সে-ই ব্যক্তি, যে নিজের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে' (তিরমিজি)।
সাকিব পিতার মৃত্যুর মাধ্যমে পার্থিব জীবনের অনিত্যতা অনুধাবন করে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের তাগিদে সৎপথে ফিরে এসেছে।
মূল্যায়ন করলে দেখা যায়— কুরআন পাঠের ক্ষেত্রে ইমাম সাহেবের মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য, শরয়ি বিধানসম্মত ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন— 'ওয়া রাত্তিলিল কুরআনা তারতিলা' অর্থাৎ আর আপনি সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে বিশুদ্ধভাবে (তাজবিদ সহকারে) কুরআন তিলাওয়াত করুন (সুরা আল-মুযযাম্মিল: ৪)। বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও তাজবিদের নিয়ম মেনে কুরআন তিলাওয়াত করা ফরজে আইন; ভুল উচ্চারণে কুরআন পড়লে অর্থের বিকৃতি ঘটে এবং সাওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রাকিব ও তার আত্মীয়স্বজন পিতার ইসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করলেও তা যদি নিয়ম না মেনে দ্রুত ও অশুদ্ধ উচ্চারণে পড়া হয়, তবে তা আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থী হয়। ইমাম সাহেব তাদের সেই অশুদ্ধতা শোধরে তাজবিদ মেনে শুদ্ধভাবে তিলাওয়াতের সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন।
সুতরাং, কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তাজবিদ ও তারতিলের ঐশী বিধান অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।
যাকাত সমাজে ধনী ও দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সুদৃঢ় সৌহার্দ্যের বন্ধন তৈরি করে বলেই রাসুলুল্লাহ (স.) যাকাতকে ইসলামের সেতুবন্ধ (ক্বোয়ান্তারাতুল ইসলাম) বলেছেন।
যাকাতের মাধ্যমে ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজে শান্তি স্থাপিত হয়।
রিফাতের নিসাব ও পরিমাণের হিসাব না করে আন্দাজে সামান্য অর্থ গরিবদের মাঝে দান করার মাধ্যমে তার ফরজ 'যাকাত আদায় হয়নি', বরং তা সাধারণ 'নফল দান বা সদকা' হিসেবে গণ্য হবে।
ইসলামি শরিয়তে যাকাত হলো নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর বাৎসরিক আড়াই শতাংশ (২.৫%) হারে সুনির্দিষ্ট খাতে বণ্টন করার একটি অকাট্য ফরজ আর্থিক ইবাদত। যাকাত আদায়ের জন্য সম্পদের সঠিক হিসাব ও নিয়ত করা শর্ত।
যেহেতু রিফাত সম্পদের পূর্ণ হিসাব না করে নিজের খেয়ালখুশিমতো সামান্য অর্থ দিয়েছে, তাই তার ফরজের দায়িত্ব আদায় হয়নি; তাকে অবশ্যই হিসাব করে বকেয়া যাকাত আদায় করতে হবে।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— ইমাম সাহেবের ইঙ্গিতকৃত আত্মশুদ্ধিমূলক ইবাদতটি হলো 'সাওম' (রোজা) এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে এর ভূমিকা অপরিসীম।
সাওমের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি সৃষ্টি করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সাওম ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো' (সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)।
সাওম পালনের মাধ্যমে মানুষ নিজের জৈবিক ক্ষুধা, পিপাসা, লোভ-লালসা, পরনিন্দা ও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করার কঠোর আত্মিক প্রশিক্ষণ লাভ করে। দীর্ঘ এক মাস আত্মসংযমের অনুশীলনের ফলে মানুষের মন থেকে হিংসা, অহংকার ও পাশবিক প্রবৃত্তি দূর হয়ে বিনয় ও সহানুভূতির বিকাশ ঘটে।
অতএব, মানুষের নফসকে পবিত্র করে যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে বিরত রেখে খাঁটি নৈতিক চরিত্র গঠনে সাওমের কোনো বিকল্প নেই।
প্রাক-ইসলামি যুগে আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল চরম অবক্ষয়গ্রস্ত, ব্যভিচার ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে নিমজ্জিত; নারীদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না এবং কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো।
গোত্রীয় অহমিকা ও তুচ্ছ কারণে দশকের পর দশক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লেগেই থাকত।
সালমানের খেলার মাঠকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের উপক্রম হলে বুদ্ধিমত্তার সাথে সমঝোতা করে গ্রামবাসীকে রক্ষা করায় মহানবি (স.)-এর কৈশোরের গঠিত ঐতিহাসিক 'হিলফুল ফুজুল' (শান্তিসংঘ) ও কাবাঘরের 'হাজরে আসওয়াদ স্থাপনকালে প্রদর্শিত প্রজ্ঞার' দিকটি ফুটে উঠেছে।
মহানবি (স.) ফিজার যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তপাত দেখে শান্তিকামী যুবকদের নিয়ে মজলুমের সাহায্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হিলফুল ফুজুল গঠন করেছিলেন। এছাড়াও হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কুরাইশদের আসন্ন যুদ্ধ তিনি চাদরে পাথর রেখে সবাইকে দিয়ে বহন করিয়ে দূর করেছিলেন।
সালমানও ঠিক একইভাবে শান্তি স্থাপন ও রক্তপাত বন্ধের মহান নবুয়তি আদর্শ বাস্তবায়ন করেছেন।
চিহ্নিত করলে দেখা যায়— জনাব সোহানুরের ইসলামি আইন বিষয়ে পাণ্ডিত্য ও জটিল ধর্মীয় সমস্যার সমাধান দেওয়ার কর্মকাণ্ড মহান মনীষী 'ইমাম আবু হানিফা (র.)'-এর সাথে চমৎকারভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ; ইসলামি আইন শাস্ত্রে (ফিকহশাস্ত্রে) তাঁর অবদান অবিসংবাদিত।
ইমাম আবু হানিফা (র.) হলেন ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ ইমাম ও হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি চল্লিশজন প্রখ্যাত আলেম ও মুজতাহিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ফিকহ একাডেমি বা আইন সম্পাদনা পরিষদ গঠন করেছিলেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর গবেষণা করে তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে তৎকালীন ও ভবিষ্যৎ জীবনের প্রায় তিরাশি হাজার জটিল সমস্যার সমাধান লিপিবদ্ধ করেন।
তাঁর এই বৈপ্লবিক অবদানের কারণে ফিকহশাস্ত্র একটি সুসংবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। যার ফলে ইমাম শাফিয়ি (র.) অকপটে স্বীকার করেছেন— 'আইনশাস্ত্রে সকল মানুষই ইমাম আবু হানিফার মুখাপেক্ষী'।
সুতরাং, ইসলামি বিচারব্যবস্থা ও ফিকহশাস্ত্রের আধুনিকায়নে ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর অবদান চিরকাল ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে ভাস্বর হয়ে থাকবে।
বুখারার তৎকালীন শাসক খালিদ ইবনে আহমদ জুহলি চেয়েছিলেন ইমাম বুখারি (র.) রাজপ্রাসাদে এসে তাঁর সন্তানদের এককভাবে হাদিস শিক্ষা দেবেন। কিন্তু ইমাম বুখারি (র.) ইলমে হাদিসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন— 'আমি জ্ঞানকে কারো দ্বারে নিয়ে অপমানিত করতে পারি না, যার প্রয়োজন সে-ই জ্ঞানের কাছে আসবে।'
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শাসক তাঁর ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করেন এবং দেশত্যাগের নির্দেশ দিলে তিনি বুখরা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর ইমাম আবু হানিফা (র.)-কে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির (কাজি উল কুজ্জাত) পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু খলিফার অন্যায় শাসন ও জুলুমের সাথে আপস করতে রাজি না হয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
ফলে খলিফা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে কারারুদ্ধ করেন এবং কারাগারে চরম নির্যাতনের পর বিষপ্রয়োগ করে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
প্রাক-ইসলামি যুগের (আইয়ামে জাহেলিয়াত) আরবরা নৈতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে চরম বর্বর ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হলেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। তারা আরবি ভাষার কাব্যচর্চা, অলঙ্কার ও বাগ্মিতায় অসাধারণ পারদর্শিতা প্রদর্শন করত।
প্রতি বছর 'উকাজ' মেলায় বিখ্যাত কবিদের মধ্যে কবিতা পাঠের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো এবং শ্রেষ্ঠ সাতটি দীর্ঘ কবিতাকে স্বর্ণাক্ষরে লিখে কাবাঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যা ইতিহাসে 'সাবআ মুআল্লাকাত' নামে পরিচিত।
ঘুষ একটি জঘন্য সামাজিক অপরাধ ও হারাম উপার্জন। ঘুষের মাধ্যমে সমাজের ন্যায়বিচার ধ্বংস হয়, যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয় এবং দুর্নীতি ও জুলুমের বিস্তার ঘটে।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'আর-রাশী ওয়াল মুরতাশী কিলাহুমা ফিন নার' অর্থাৎ ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহণকারী উভয়েই জাহান্নামি। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.) এ ধরনের অবৈধ লেনদেনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও চিরতরে বর্জনীয় ঘোষণা করেছেন।
রাকিবের কর্মকাণ্ডে ইসলামি শরিয়ত ও নৈতিকতায় চরম নিষিদ্ধ 'গিবত' (পরনিন্দা বা অসাক্ষাতে কারো দোষচর্চা করা) ফুটে উঠেছে।
কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা অপ্রিয় বিষয় আলোচনা করা যা শুনলে সে কষ্ট পাবে, তাকে গিবত বলে। আল-কুরআনে গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য অপরাধের সাথে তুলনা করে একে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
ওয়াদা বা অঙ্গীকার পালন করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আখলাকে হামিদাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মুনাফিকের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন— 'যে ব্যক্তি চুক্তি বা ওয়াদা রক্ষা করে না, দ্বীন-ইসলামে তার কোনো পূর্ণাঙ্গ স্থান বা নিষ্ঠা নেই।' ওয়াদা ভঙ্গ করলে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শান্তি বিনষ্ট হয় বলেই ইসলামে অঙ্গীকার রক্ষা করা অপরিহার্য।
তাকওয়া অর্থ আল্লাহভীতি ও সব ধরনের পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। নৈতিক জীবনে তাকওয়ার প্রভাব অপরিসীম; এটি মানুষের অন্তরে সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি জাগ্রত রাখে।
তাকওয়াবান মানুষ লোকচক্ষুর অন্তরালেও চুরি, মিথ্যা, ব্যভিচার ও দুর্নীতির মতো পাপে লিপ্ত হয় না। ফলে ব্যক্তি জীবনে সততা, ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সমাজে শান্তি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিরাজ করে।
রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অবৈধ শক্তি প্রয়োগ করে সমাজে ভয়ভীতি, নৈরাজ্য, খুন-খারাবি, বোমাবাজি ও জানমালের ক্ষতিসাধন করার উগ্র কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসবাদ বলে।
ইসলামে সন্ত্রাসবাদকে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ' (সুরা আল-বাকারা: ১৯১)।
রফিকের কর্মকাণ্ডে শরিয়তসম্মতভাবে 'যাকাত' আদায়ের দিকটি ফুটে উঠেছে। যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি মৌলিক আর্থিক ইবাদত।
যাকাতের মাধ্যমে সমাজের ধনীদের পুঞ্জীভূত সম্পদ দরিদ্র ও অভাবী মানুষের মাঝে প্রবাহিত হয়। ফলে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস পায়, দারিদ্র্য বিমোচন ঘটে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুষম প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।
যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (স.) সাধারণ মানবীয় অভ্যাস হিসেবে পালন করেছেন কিন্তু তা পালনে উম্মতের ওপর কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা আরোপ করেননি, তাকে সুন্নাতে যায়িদাহ বা সুন্নাতে গাইরে মুয়াক্কাদাহ বলে।
যেমন— রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পোশাক পরিধানের ধরন, দাঁড়ানোর বা বসার ভঙ্গি, কিংবা আসরের ফরজের পূর্বে চার রাকাত নফল সালাত আদায় করা। এটি পালন করলে অফুরন্ত সওয়াব পাওয়া যায়, তবে পালন না করলে কোনো গুনাহ হয় না।
আল্লাহ তায়ালা যেসব কাজ ও বস্তু শরিয়তের অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন, তাকে হারাম বলে। হারাম বর্জন করা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য ফরজ।
হারাম খাদ্য ও উপার্জনের দ্বারা মানুষের অন্তর কলুষিত হয়, ইবাদত-বন্দেগি কবুল হয় না এবং তা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর চরম গজব ও জাহান্নামের আজাব ডেকে আনে বলেই হারাম সম্পূর্ণ বর্জনীয়।
মাহিদ শরিয়তের 'ফরজে কিফায়াহ' হুকুম পালন করেছে।
ফরজে কিফায়াহ হলো এমন সমষ্টিগত ফরজ দায়িত্ব, যা সমাজের কিছু লোক আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায় এবং অন্যরা দায়মুক্ত হয়; কিন্তু কেউই আদায় না করলে গোটা সমাজের সবাই গুনাহগার হয়। জানাযার সালাত ফরজে কিফায়াহর অন্যতম প্রধান উদাহরণ।
আখিরাত বা পরকালে বিশ্বাস হলো ঈমানের সাতটি মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম। আখিরাতে বিশ্বাস মানুষকে দুনিয়ায় জবাবদিহিমূলক ও নৈতিক জীবনযাপনে বাধ্য করে।
যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর পর প্রতিটি ভালো-মন্দ কাজের জন্য আল্লাহর কাছে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে, সে কখনো অন্যায়ে লিপ্ত হতে পারে না। আখিরাত অস্বীকার করলে মানুষের ঈমানই বাতিল হয়ে যায়।
কুফর হলো ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলোকে অস্বীকার করা বা গোপন করা। কুফরের ফলে মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও পরকালের জবাবদিহিতার অনুভূতি থাকে না।
আল্লাহভীতিহীন কাফির মানুষ পার্থিব স্বার্থে মিথ্যা, প্রতারণা, ব্যভিচার ও জুলুমের মতো অনৈতিক কাজে অনায়াসে লিপ্ত হয়। ফলে সমাজে পাপাচার ও নৈরাজ্যের প্রসার ঘটে।
তকদির অর্থ আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য বা পরিমাপ। মহাবিশ্বের ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটে, তা সবই সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর জ্ঞান ও ইচ্ছায় ঘটে— এই বিশ্বাস পোষণ করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ।
তকদিরে বিশ্বাস মানুষকে বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে শেখায় এবং চরম সাফল্যেও অহংকারমুক্ত রেখে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ কৃতজ্ঞ ও তাওয়াক্কুলশীল করে তোলে।